চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের পুশইন, নারী-শিশুসহ ১৭ জন আটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৮ বার
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের পুশইন, নারী-শিশুসহ ১৭ জন আটক

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যু আবারও আলোচনায় এসেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চাড়ালডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১৭ জন বাংলাদেশিকে পুশইন করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। মঙ্গলবার গভীর রাতে সীমান্ত পিলারসংলগ্ন এলাকা দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। পরদিন বুধবার ভোরে সীমান্ত থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার ভেতরে শিবনগর বাজার এলাকা থেকে তাদের আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ঘটনাটি শুধু একটি সীমান্ত অনুপ্রবেশের খবর নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ কারাবাস, অনিশ্চিত জীবন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্ন।

বিজিবি-১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আটক ব্যক্তিরা সীমান্ত পিলার ২১৯/২৯-আর সংলগ্ন এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সীমান্তে রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশ অংশে ঠেলে দেয়। পরে বিজিবির নিয়মিত টহল ও স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে খবর পেয়ে শিবনগর বাজার এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। আটক ১৭ জনের মধ্যে আটজন পুরুষ, পাঁচজন নারী এবং চারজন শিশু রয়েছে। তারা সবাই খুলনা ও যশোর জেলার বাসিন্দা বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।

আটক ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী, জীবিকার সন্ধানে বা নানা সামাজিক বাস্তবতায় তারা কয়েক বছর আগে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে গিয়ে তারা ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন এবং পরে আগ্রা কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি তাদের সাজা শেষ হয়। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে ভারতীয় পুলিশ তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র, পরিচয় যাচাই বা দুই দেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করা হয় বলে তারা অভিযোগ করেন।

আটক নারীদের একজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “জেলে থাকাকালে আমরা শুধু দিন গুনেছি কবে দেশে ফিরব। ভেবেছিলাম মুক্তির পর হয়তো নিয়ম মেনেই দেশে পাঠাবে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে হঠাৎ করে সীমান্তে নামিয়ে দিয়ে বলা হলো, সামনে যাও। শিশুদের নিয়ে আমরা তখন কী করব বুঝতে পারছিলাম না।” তার কথায় ফুটে ওঠে দীর্ঘ বন্দিজীবনের মানসিক চাপ এবং মুক্তির পরও অনিশ্চয়তার ভয়।

গোমস্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল বারিক জানান, আটক সবাই বাংলাদেশের নাগরিক বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিজিবি তাদের থানায় হস্তান্তর করেছে। এখন পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

এই ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে একাধিকবার পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর ভোরে একই জেলার বিভীষণ সীমান্ত দিয়ে এক কিশোরীসহ পাঁচজনকে পুশইন করে বিএসএফ। এর আগে ২২ ডিসেম্বর ভোলাহাট সীমান্ত দিয়ে ১২ নারী ও পাঁচ শিশুসহ মোট ২৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। ১৪ ডিসেম্বর গোমস্তাপুর উপজেলার বিভীষণ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১৫ জনকে পুশইনের ঘটনা ঘটে। এরও আগে ২৭ মে বিভীষণ সীমান্ত দিয়ে ১৭ জন এবং ৩ জুন চানশিকারী সীমান্ত দিয়ে আটজনকে পুশইন করা হয়েছিল।

সীমান্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ঘটনায় একটি ধারাবাহিক প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। সাজা ভোগ শেষে ভারতীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশিদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত না পাঠিয়ে পুশইনের পথ বেছে নিচ্ছে বিএসএফ। এতে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছে, একই সঙ্গে মানবিক সংকটও তৈরি হচ্ছে। শিশু ও নারীদের এভাবে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে ফেলে দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্বিগ্ন। শিবনগর বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “ভোরের দিকে দেখি বিজিবি কয়েকজন নারী-শিশুসহ মানুষ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পরে জানতে পারি ওরা সবাই পুশইনের শিকার। সীমান্তে এমন ঘটনা বাড়লে এলাকার নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়।” স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত পুশইনের ফলে সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে এবং দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পুশইন কোনো সমাধান নয়। সাজা শেষে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। এর ব্যত্যয় হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয় এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাও ক্ষুণ্ন হয়।

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্ট সীমান্ত বাহিনীর সঙ্গে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, আলোচনার মধ্যেও পুশইনের ঘটনা থামছে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১৭ জনের সাম্প্রতিক পুশইন আবারও প্রমাণ করে, সীমান্ত শুধু ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যারা জীবনের তাগিদে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল, তারা আজ দীর্ঘ কারাবাস শেষে নিজ দেশে ফিরেও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং দুই দেশের সমন্বিত উদ্যোগই পারে সীমান্তে বারবার ফিরে আসা এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত