গাজায় সৈন্য পাঠানো নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
গাজায় বাংলাদেশি সৈন্য পাঠানো

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজায় বাংলাদেশি সৈন্য পাঠানো নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে কেবল প্রাথমিক পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা চলছে, এর বেশি কিছু নয়। নির্দিষ্ট কয়েকটি শর্ত পূরণ না হলে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই গাজায় ফোর্স পাঠাবে না—এ কথাও পরিষ্কার করে দেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান—সবকিছু বিবেচনায় রেখেই সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি দেখছে বলে জানান উপদেষ্টা।

বুধবার ১৪ জানুয়ারি বিকেলে সচিবালয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সমসাময়িক ইস্যু বিষয়ক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তৌহিদ হোসেন। ব্রিফিংয়ে গাজা পরিস্থিতির পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তে চলমান সংঘাত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পোস্টাল ভোট, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক ইস্যু উঠে আসে।

গাজায় বাংলাদেশ থেকে সৈন্য পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘গাজায় ফোর্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। মাত্র আলাপ-আলোচনা চলছে। কারণ এখনো কোনো কিছু ঠিক হয়নি—কারা থাকবে, কারা থাকবে না, সেটাও স্পষ্ট নয়। যে তিনটি শর্তের কথা বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই এই পরিবেশ সৃষ্টি না হলে আমরা যাবো না।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গাজায় বাংলাদেশি ফোর্স পাঠানো নিয়ে সরকার কোনো তাড়াহুড়ো করছে না; বরং পরিস্থিতির সব দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমত, আমরা যুদ্ধ করতে যাবো না। দ্বিতীয়ত, এমন কোনো কর্তৃপক্ষ থাকবে যাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করা বা কথাবার্তা বলাই সম্ভব না—সেক্ষেত্রে আমরা যাবো না। আমাদের শর্তগুলো পরিষ্কার। যদি এই শর্তগুলোতে সবাই রাজি হয়, এরপর আলোচনা এগোবে।’ উপদেষ্টার এই বক্তব্যে বোঝা যায়, বাংলাদেশ কেবল শান্তিরক্ষা বা মানবিক সহায়তার মতো কাঠামোর মধ্যেই সম্ভাব্য কোনো ভূমিকায় আগ্রহী হতে পারে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরাসরি জড়ানোর প্রশ্নই ওঠে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজা ইস্যুতে বাংলাদেশের এই সতর্ক অবস্থান দেশটির দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে এলেও সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে বরাবরই সংযত অবস্থান নিয়েছে। তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি জানান, মিয়ানমারের ভেতরে চলমান সংঘাত ও আরাকান আর্মির তৎপরতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর হওয়ার কারণে দেশ হিসেবে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব নয় ঢাকার। মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যা একদিনে সমাধান সম্ভব নয়,’—বলেন তিনি। এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলের মধ্যেই সমাধানের চেষ্টা করছে, তবে তা সময়সাপেক্ষ।

তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার ইস্যুতে মাঠ পর্যায়ে কী ঘটছে, তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় জানে না। এর মাধ্যমে তিনি বাস্তবতা তুলে ধরে বোঝাতে চান, সীমান্ত পরিস্থিতির সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র থেকে জানা সব সময় সম্ভব হয় না। তবুও বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের পোস্টাল ভোট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘শিগগির পোস্টাল ব্যালট প্রবাসীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ভোট দেওয়ার পর বাংলাদেশ মিশন ডাকযোগে সেই ব্যালট পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খুব বেশি কিছু করার নেই।’ তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়েই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখানে সহযোগী ভূমিকা পালন করছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়েও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছে। ‘বিষয়টি নিয়ে অগ্রগতি হলে জানানো হবে,’—বলে তিনি এ প্রসঙ্গে আর বিস্তারিত কিছু জানাননি। কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ঢাকা।

সামগ্রিকভাবে প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে আবেগ নয়, বরং বাস্তবতা, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। গাজা ইস্যুতে সৈন্য পাঠানো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও সেই নীতিরই প্রতিফলন দেখা গেছে। মানবিক সহানুভূতি থাকলেও সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার প্রশ্নে সরকার কঠোর শর্ত আরোপ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে যেকোনো দেশের জন্যই সেখানে ফোর্স পাঠানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য সেই সচেতনতারই বহিঃপ্রকাশ।

সব মিলিয়ে গাজায় বাংলাদেশি সৈন্য পাঠানো নিয়ে যে নানা গুঞ্জন ও আলোচনা চলছে, সেগুলোর মধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই স্পষ্ট বক্তব্য একটি নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সরকার যে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং কঠোর শর্ত পূরণ না হলে এমন কোনো উদ্যোগে যাবে না—এই বার্তাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে তাঁর কথায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত