প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফ্রিকার আকাশপথে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে ইথিওপিয়া। মহাদেশটির বিমান চলাচল ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশটি নির্মাণ শুরু করেছে চারটি রানওয়ে বিশিষ্ট একটি বিশাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা সম্পন্ন হলে ‘আফ্রিকার বৃহত্তম বিমানবন্দর’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পটি শুধু ইথিওপিয়ার নয়, গোটা আফ্রিকার অর্থনীতি, বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই বিমানবন্দরটির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বিশোফতু শহরে গড়ে উঠছে আন্তর্জাতিক মানের এই বিমানবন্দর। শহরের নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘বিশোফতু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট’। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স নিজেই এই বিমানবন্দরের নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে, যা দেশটির বিমান খাতের সক্ষমতার ওপর সরকারের আস্থারই প্রতিফলন।
বর্তমানে ইথিওপিয়ায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি বিমানবন্দর রয়েছে বলে জানায় এয়ারপোর্ট রুটস। এসব বিমানবন্দরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আদ্দিস আবাবার বোলি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, যা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির প্রধান বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে গিয়ে এই বিমানবন্দরটি ইতোমধ্যে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতা থেকেই নতুন মেগা বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স বর্তমানে আফ্রিকার বৃহত্তম বিমান সংস্থা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ছয়টি নতুন আন্তর্জাতিক রুট যুক্ত করেছে এবং যাত্রী ও কার্গো পরিবহনে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করতেই বিশোফতু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টকে একটি কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন বিমানবন্দরটি চালু হলে ইথিওপিয়া আফ্রিকার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাবে পরিণত হবে—এমন প্রত্যাশা দেশটির নীতিনির্ধারকদের।
গত শনিবার, ১০ জানুয়ারি, আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন করে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলি একে আফ্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিমান অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, বিশোফতু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইথিওপিয়াকে বৈশ্বিক বিমান চলাচলের মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে। এটি কেবল একটি বিমানবন্দর নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন বিমানবন্দরে একসঙ্গে ২৭০টি বিমান পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে এবং বছরে সর্বোচ্চ ১১ কোটি যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। এই সংখ্যা ইথিওপিয়ার বর্তমান প্রধান বিমানবন্দরের সক্ষমতার চার গুণেরও বেশি। তিনি আরও জানান, বর্তমান বোলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই যাত্রীচাপ সামাল দিতে অক্ষম হয়ে পড়বে। ফলে নতুন বিমানবন্দরটি সময়ের প্রয়োজনেই নির্মাণ করা হচ্ছে।
বিশোফতু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে চারটি আধুনিক রানওয়ে থাকবে, যা একসঙ্গে বহু বিমান ওঠানামা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। এর ফলে ফ্লাইট জট কমবে, সময় বাঁচবে এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইথিওপিয়ার আকাশপথে যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে। পাশাপাশি ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, যা বাণিজ্য ও পর্যটন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই বিশাল প্রকল্পটির মোট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রথম দিকে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ বিলিয়ন ডলার, তবে পরবর্তীতে নকশা সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বাড়ানো হয়। ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং ডিরেক্টর আব্রাহাম তেসফায়ে সাংবাদিকদের জানান, মোট ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থায়ন করবে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স নিজেই। বাকি অর্থ আসবে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে ৬১ কোটি ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ভূমি উন্নয়ন বা আর্থওয়ার্কস কাজের জন্য, যা এক বছরের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। মূল নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদাররা ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে পূর্ণমাত্রায় কাজ শুরু করবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিমানবন্দরটির নির্মাণ সম্পন্ন হবে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংস্থাটি গত আগস্টে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং আরও ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের নেতৃত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ঋণদাতা সংস্থা এই প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন আব্রাহাম তেসফায়ে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশোফতু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং আফ্রিকার বিমান চলাচলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। বর্তমানে যাত্রী ও বিমান ওঠানামার সংখ্যার দিক থেকে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত বিমানবন্দর হলো মিশরের কায়রো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। তবে বিশোফতু বিমানবন্দর চালু হলে সেই অবস্থানেও পরিবর্তন আসতে পারে।
ইথিওপিয়ার জন্য এই প্রকল্পের আরেকটি বড় দিক হলো কর্মসংস্থান। নির্মাণকালীন সময়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, আর বিমানবন্দর চালু হওয়ার পর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও বহু মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশটির পর্যটন, রপ্তানি ও সেবা খাতে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিশোফতু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ইথিওপিয়ার উন্নয়ন অভিযাত্রায় এক সাহসী ও কৌশলগত পদক্ষেপ। আফ্রিকার আকাশপথে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা দেশটি এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্টভাবেই বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে।