ইংল্যান্ড দলে মদ্যপানের সংস্কৃতি নেই: ব্রডের স্পষ্ট বার্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার
স্টুয়ার্ট ব্রড

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৪-১ ব্যবধানে পরাজয়ের পর মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। বিশেষ করে সিরিজ চলাকালীন এবং ম্যাচ-পরবর্তী সময়ে ইংলিশ ক্রিকেটারদের মদ্যপান নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একাধিক ছবি ও ঘটনার বিবরণ, যা দলের পেশাদার ভাবমূর্তিকে আঘাত করেছে বলে মত অনেকের। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক ইংল্যান্ড পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান ইংল্যান্ড টেস্ট দলে কোনোভাবেই ‘মদ্যপানের সংস্কৃতি’ নেই। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, কিছু ঘটনায় খেলোয়াড়রা আরও দায়িত্বশীল হলে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব ছিল।

৩৯ বছর বয়সী স্টুয়ার্ট ব্রড ছিলেন ইংল্যান্ডের তথাকথিত ‘বাজবল’ যুগের শুরুর দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। আগ্রাসী মানসিকতা ও আক্রমণাত্মক ক্রিকেট দর্শনের এই যুগে ব্রডের অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ২০২৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের হয়ে ১৫টি টেস্টে ৬৭ উইকেট নেওয়া এই পেসার ওভালে শেষ টেস্ট ড্র করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। অবসরের পরও চলতি অস্ট্রেলিয়া সফরে তিনি ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক হিসেবে ব্রডকাস্ট চ্যানেলে যুক্ত থেকে দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, যা তাকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত হয় সিডনিতে সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টেস্টে হারের পর। ম্যাচ শেষের কয়েক দিন পর নিউজিল্যান্ডের একটি নাইটক্লাবে ইংল্যান্ডের টেস্ট সহ-অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের সঙ্গে বাউন্সারের বাকবিতণ্ডার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ওই ঘটনায় ব্রুককে ৩০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয় এবং পরে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান। একই সময়ে সিরিজের বিরতিতে অস্ট্রেলিয়ার নুসা এলাকায় কয়েকজন ইংলিশ ক্রিকেটারকে মদ্যপ অবস্থায় দেখা যাওয়ার খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেই তালিকায় ছিলেন ওপেনার বেন ডাকেটও। রাস্তায় দিশেহারা অবস্থায় কথা জড়াতে দেখা যাওয়ার ছবিগুলো নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়।

এই ঘটনাগুলোর পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে ইংল্যান্ড দলের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এমনকি শ্রীলঙ্কা সফরের আগে এবং সামনে থাকা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড আবারও রাত ১২টার কারফিউ আরোপ করতে পারে—এমন আলোচনা শুরু হয়। অতীতে ইংল্যান্ড দলে এ ধরনের বিধিনিষেধ থাকলেও বর্তমান ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা দেওয়ার পক্ষপাতী বলে পরিচিত।

‘দ্য লাভ অব ক্রিকেট’ নামের একটি জনপ্রিয় পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে স্টুয়ার্ট ব্রড এই প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে পুরো দলকে এক কাতারে ফেলা ঠিক নয়। তার ভাষায়, ‘কয়েকজন খেলোয়াড় ভুল করেছে, আর সেটাই বড় করে গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে দলে মদ্যপানের কোনো সংস্কৃতি আছে। শক্তিশালী দলীয় সংস্কৃতি মানে হলো—খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই সতীর্থরা একে অন্যকে সামলে নেবে।’

ব্রডের মতে, এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দলীয় দায়িত্ববোধ। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বেন ডাকেট যেন একা পড়ে না থাকে বা হোটেলের ঠিকানা না জানার মতো অবস্থায় না পৌঁছায়—এটা শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো দলের দায়িত্ব। একইভাবে হ্যারি ব্রুক যেন কোনো বাউন্সারের সঙ্গে ঝামেলায় না জড়ায়, সেটাও সতীর্থদের সচেতনতার বিষয়। ব্রড মনে করেন, মাঠের বাইরের সময়েও দল হিসেবে একসঙ্গে থাকা এবং একে অন্যকে খেয়াল রাখা পেশাদারিত্বেরই অংশ।

রাত ১২টার কারফিউ প্রসঙ্গে ব্রডের অবস্থান আরও পরিষ্কার। তিনি বলেন, ‘কারফিউ আমার কখনোই পছন্দ ছিল না। আমি মনে করি না একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে এমন নিয়ম দিয়ে বেঁধে রাখা উচিত। তারা প্রাপ্তবয়স্ক, দায়িত্বশীল মানুষ। সতীর্থরা পাশে থাকলে ঠিক সময়েই বলা যায়—এবার ফেরার সময়।’ তার মতে, অতিরিক্ত কড়াকড়ি অনেক সময় উল্টো ফল বয়ে আনে এবং খেলোয়াড়দের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

ইংল্যান্ড দলের মাঠের বাইরের আচরণকে কেউ কেউ পেশাদারিত্বের অভাব হিসেবে দেখলেও ব্রড বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ক্রিকেটারদের জীবন বাস্তবে যতটা সুন্দর মনে হয়, তার ভেতরে ততটাই কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। বছরের প্রায় ছয় মাস তাদের কাটাতে হয় হোটেল কক্ষে, পরিবার ও স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে। সেই একঘেয়েমি ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তির জন্য কিছুটা বিরতি বা ‘সুইচ-অফ’ দরকার। তিনি অবশ্য স্পষ্ট করেন, সেই বিরতি মানেই মদ্যপান নয়। কারও জন্য তা হতে পারে গান শোনা, কারও জন্য সিনেমা দেখা বা সতীর্থদের সঙ্গে সময় কাটানো।

এই বিতর্কে পডকাস্টে উপস্থিত ছিলেন ইংল্যান্ডের তারকা ব্যাটার ও সাবেক অধিনায়ক জস বাটলারও। তবে ব্রডের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হননি তিনি। বাটলার বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার অর্থই হলো বাড়তি দায়িত্ব নেওয়া। তার ভাষায়, ‘সতীর্থরা আপনাকে দেখভাল করবে ঠিকই, কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন না। পেশাদার জীবনযাপন করতে হবে এবং সেটাকে সেভাবেই উপস্থাপন করতেও হবে।’ বাটলারের এই বক্তব্যে দলের ভেতরের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে স্টুয়ার্ট ব্রডের বক্তব্য ইংল্যান্ড দলের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তিনি যেমন দলে মদ্যপানের সংস্কৃতি নেই বলে দৃঢ়ভাবে দাবি করেছেন, তেমনি খেলোয়াড়দের দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করেননি। অ্যাশেজ পরবর্তী এই বিতর্ক ইংল্যান্ড ক্রিকেটে শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সামনে শ্রীলঙ্কা সফর ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বড় আসর থাকায়, এই শিক্ষা থেকে কতটা শিক্ষা নিতে পারে ইংল্যান্ড দল—সেদিকেই এখন তাকিয়ে ক্রিকেটবিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত