আলিফ হত্যা মামলায় বিচার শুরুর পথে, ১৯ জানুয়ারি চার্জ গঠন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার
আইনজীবী আলিফ হত্যা

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামে আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগামী ১৯ জানুয়ারি এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠনের দিন ধার্য করেছেন আদালত। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাহিদুল হক শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তে নিহত আলিফের পরিবার, সহকর্মী আইনজীবী ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশী সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি এস ইউ এম নুরুল ইসলাম জানান, আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলার নথিপত্র বিচারিক আদালত গ্রহণ করেছে এবং মামলাটি এখন চার্জ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ২৩ আসামির মধ্যে ২২ জনকে আদালতে হাজির করা হয়। নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি আসামিকে আদালতে উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি। আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, আগামী ১৯ জানুয়ারি আসামিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হবে।

আদালত সূত্র জানায়, মামলার অন্যতম আলোচিত আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে নিরাপত্তাজনিত কারণে এদিন আদালতে হাজির করা হয়নি। মামলার গুরুত্ব, অতীত অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য উত্তেজনা বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আদালতে আনার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। প্রসিকিউশন পক্ষ জানায়, চার্জ গঠনের দিন সব প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আসামিদের আদালতে হাজির করা হবে। এই মামলায় এখনো ১৬ জন আসামি পলাতক রয়েছেন বলেও আদালতকে জানানো হয়েছে।

আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ড চট্টগ্রামের আইন অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালত ভবন এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে। ওইদিন সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষের একপর্যায়ে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত প্রাঙ্গণের মতো একটি সংবেদনশীল ও নিরাপত্তা-ঘেরা এলাকায় এমন নৃশংস ঘটনা ঘটায় অনেকেই হতবাক হয়ে পড়েন। আইনজীবী আলিফ ছিলেন একজন পেশাদার ও পরিচিত মুখ। সহকর্মীদের কাছে তিনি শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার এমন মৃত্যু আইনজীবী সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ঘটনার পরপরই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনজীবীরা কর্মবিরতি ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তারা দ্রুত তদন্ত, দোষীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। তদন্ত চলাকালে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিভিন্ন সূত্র, ভিডিও ফুটেজ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আসামিদের শনাক্ত করে। একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিযুক্ত পলাতক রয়েছে, যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রসিকিউশন পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা চলায় তারা আশা করছেন, বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিক আদালতের তুলনায় দ্রুত এগোবে। চার্জ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের পর্যায় আসবে। তবে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা না গেলে বিচার প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিহত আলিফের পরিবার আদালতের সিদ্ধান্তে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা শুরু থেকেই ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। আদালতে চার্জ গঠনের দিন ধার্য হওয়ায় তারা কিছুটা হলেও মানসিক স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তাদের উদ্বেগ—যেন প্রভাবশালী কেউ বা কোনো মহল এই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। তারা দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

আইন অঙ্গনের বিশ্লেষকদের মতে, আদালত প্রাঙ্গণে একজন আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হত্যা দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ঘটনা। এই মামলার বিচার শুধু একটি ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়; বরং এটি আইনজীবীদের নিরাপত্তা, আদালত চত্বরে শৃঙ্খলা এবং আইনের শাসনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাই এই মামলার রায় ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের অবস্থান শনাক্তে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। চার্জ গঠনের আগেই অন্তত কয়েকজন পলাতককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সব মিলিয়ে, আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় ১৯ জানুয়ারি চার্জ গঠন শুধু একটি তারিখ নয়; এটি ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই বিচার প্রক্রিয়ার দিকে এখন তাকিয়ে আছে চট্টগ্রামের আইন অঙ্গন থেকে শুরু করে সারা দেশের সচেতন নাগরিকরা। তারা প্রত্যাশা করছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই মামলার বিচার হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত