বোনাস ফসলে সরিষার বিপ্লব, যশোরে ভোজ্যতেলের নতুন আশা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮ বার
বোনাস ফসলে সরিষার বিপ্লব, যশোরে ভোজ্যতেলের নতুন আশা

প্রকাশ:  ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যশোরের মাঠঘাটে এখন যেন নেমে এসেছে হলুদ রঙের উৎসব। দিগন্তজোড়া জমিতে ফুটে থাকা সরিষার ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে দেশের ভোজ্যতেল সংকট কাটানোর এক শক্ত আশার বার্তাও দিচ্ছে। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হওয়ায় কৃষি বিভাগ, চাষি এবং নীতিনির্ধারকদের চোখে নতুন সম্ভাবনার আলো দেখা যাচ্ছে। তিন মাসের স্বল্প সময়ের এই ‘বোনাস ফসল’ ঘিরে যশোরে তৈরি হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার বাজার, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কয়েক বছর আগেও যশোরে আমন ধান কাটার পর অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। বোরো ধানের প্রস্তুতি শুরু হতে সময় লাগত, সেই মধ্যবর্তী সময়টুকু কাজে লাগানো হতো না। কৃষি বিভাগের পরিকল্পিত উদ্যোগ, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষকদের আগ্রহে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করে। চলতি বছর এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। জেলার আটটি উপজেলায় মোট ২৭ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে, যা পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। মাঠে মাঠে ছড়িয়ে পড়া সরিষার হলুদ ফুল যেন এই সাফল্যের নীরব সাক্ষ্য বহন করছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, আমন ধান ওঠার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের প্রায় তিন মাস সময়কে কাজে লাগিয়ে বারি সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৪ জাতের চাষ করা হচ্ছে। এই জাতগুলো স্বল্প সময়ে ফলন দেয়, রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং তেল উৎপাদনের হারও বেশি। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত রোদ, মাঝারি শীত এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় এবছর ফলনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

যশোর সদর উপজেলার হাশিমপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিমের চোখেমুখে এখন স্বপ্নের ঝিলিক। তিনি বলেন, ধান কাটার পর তার বেশ কিছু জমি আগে পড়ে থাকত। কৃষি অফিসের পরামর্শে এবার সেই জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন। গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে, ফুলে ফুলে মাঠ ভরে গেছে। তার আশা, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন অনেক বেশি হবে। খরচ কম হওয়ায় লাভও হবে উল্লেখযোগ্য। তার মতো অনেক কৃষকই এবার সরিষা চাষকে বাড়তি আয়ের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

একই উপজেলার আরেক কৃষক মো. মোবারক হোসেন জানান, সরিষা চাষে সময় ও খরচ দুটোই কম লাগে। সার ও সেচের প্রয়োজন কম হওয়ায় ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। আমন ও বোরোর মাঝের এই সময়টুকুতে সরিষা চাষ করে তিনি পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করতে পারছেন। বাজারদর ভালো থাকলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে সরিষা চাষ করার পরিকল্পনাও করছেন তিনি।

এনায়েতপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক জানান, তিনি ছয় বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন। তার হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় ২৫ মণ সরিষা উৎপন্ন হবে, যা বিক্রি করে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা আয় সম্ভব। তার গ্রামেই দেড়শ বিঘার বেশি জমিতে এবার সরিষা চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, আগে এই জমিগুলো বছরের একটা সময় একেবারে অব্যবহৃত থাকত। এখন সেই জমি থেকেই আয় আসছে, যা গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।

কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের এই আগ্রহের পেছনে প্রণোদনা ও নিয়মিত পরামর্শ বড় ভূমিকা রেখেছে। যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহির রায়হান জানান, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সরিষা আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শুধু তার ইউনিয়নেই গত বছর যেখানে ১৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল, সেখানে এবার তা বেড়ে প্রায় ১৮০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের ফলে উৎপাদনও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।

তিনি আরও জানান, সরিষা চাষ মূলত দুই ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে হওয়ায় জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। রোপা আমনের পরপরই সরিষা চাষ শুরু করা যায় এবং ফসল ওঠার পর সময়মতো বোরো ধানের চাষও করা সম্ভব হয়। এতে জমির উর্বরতা বজায় থাকে এবং কৃষক একই জমি থেকে বছরে একাধিক ফসল পেয়ে লাভবান হন। তার হিসেবে, বিঘাপ্রতি সরিষা চাষে খরচ হয় মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা, অথচ বিক্রি করে গড়ে বারো হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) সমরেণ বিশ্বাস বলেন, দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি মেটাতে সরিষা চাষ একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাংলাদেশ এখনও বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়ভাবে সরিষা উৎপাদন বাড়ানো গেলে এই আমদানি নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, যাতে ফলন ভালো হয় এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পান।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় প্রায় ৩৩ হাজার ৪৩২ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ শুধু কৃষকদের হাতে পৌঁছাবে না, বরং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও শ্রমবাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরিষা চাষ সম্প্রসারণের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও তেল উৎপাদন প্রক্রিয়া আধুনিক করা গেলে দেশের ভোজ্যতেল শিল্পে নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে। যশোরের সফলতা অন্য জেলাগুলোতেও অনুসরণ করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে তেল উৎপাদনে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে যশোরের সরিষা ক্ষেত শুধু হলুদ ফুলের সৌন্দর্য নয়, বরং কৃষকের পরিশ্রম, পরিকল্পিত কৃষি নীতি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই ‘বোনাস ফসল’ যদি প্রত্যাশিত ফলন দেয়, তবে ভোজ্যতেলের সংকট কাটানোর পথে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত