রংপুরের ছয় আসনে ভোটের লড়াই, শক্ত অবস্থানে জামায়াত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২২ বার
রংপুরের ছয় আসনে জামায়াত শক্ত অবস্থান

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দেড় যুগের একটানা সাজানো নির্বাচন, রাতের ভোট এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংসদ সদস্য তৈরির রাজনীতির পর রংপুরে আবারও ফিরছে ভোটের উত্তাপ। ‘নতুন বাংলাদেশে’ স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশায় রংপুর বিভাগের ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রায় ২৬ লাখ ভোটার এবার ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের মতামত প্রকাশের অপেক্ষায়। শহর থেকে গ্রাম—চায়ের দোকান, হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা পাড়া-মহল্লার আড্ডা—সবখানেই আলোচনার মূল বিষয় একটাই, রংপুরের ছয়টি আসন থেকে কারা যাচ্ছেন জাতীয় সংসদে।

রংপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, এই বিভাগের ছয়টি সংসদীয় আসন থেকে কখনো বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী থেকে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাই এখানে বিজয়ী হয়ে এসেছেন। তবে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সাবেক সংসদ সদস্য কেউ কারাগারে, কেউ পলাতক। আর জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতারা তীব্র জনরোষের মুখে পড়ার আশঙ্কায় অনেকটাই আত্মগোপনে। এই শূন্যতার মধ্যেই রংপুরের রাজনীতিতে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

বর্তমানে ছয়টি আসনেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন দলের মনোনীত প্রার্থীরা। বিএনপি মূলত তারেক রহমানের রাজনৈতিক ইমেজ এবং দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগবিরোধী ভোটব্যাংকের ওপর ভর করে এগোতে চাইছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সংগঠিত কাঠামো, মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা এবং তরুণ ও নারী ভোটারদের সমর্থনকে পুঁজি করে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকার কারণে এনসিপিও কিছু আসনে আশার আলো দেখছে। তবে ভোটারদের বড় একটি অংশই এবার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

রংপুর-১ আসন, যা গঙ্গাচড়া উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ বহুমাত্রিক। বিএনপির টিকিট পেয়েছেন একসময় দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা মোকাররম হোসেন সুজন। পুরোনো বিরোধ ও বিভক্ত নেতাকর্মীদের একত্র করে তিনি জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে অনেক আগেই মাঠে নেমেছেন মাওলানা রায়হান সিরাজী, যিনি নিয়মিত ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় এই আসনে দলটি কার্যত কোণঠাসা। ফলে জামায়াত ও বিএনপির পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, বাসদ (মার্কসবাদী), জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থীদের মধ্যে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রংপুর-২ আসন, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ নিয়ে গঠিত, সেখানে সবচেয়ে আলোচিত নাম জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম। দীর্ঘ সাড়ে ১৩ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশ নিয়ে কারাবন্দি থাকা এই নেতাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক সহানুভূতি ও সমর্থন তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে পারেন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে জাতীয় পার্টি থেকে আসা মোহাম্মদ আলী সরকারকে, যা নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দলীয় বিভক্তি বিএনপির জন্য বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। এই আসনে জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মণ্ডল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আশরাফ আলীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

রংপুর-৩ আসন, যা বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত, এখানে রাজনৈতিক উত্তাপ সবচেয়ে বেশি। বিএনপির প্রার্থী মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন ও বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের সহযোগিতার অভিযোগ থাকলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল আগেভাগেই মাঠে নেমে সংগঠিত প্রচারণা চালাচ্ছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও এই আসনে প্রার্থী, তবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ। সাধারণ ভোটারদের বড় অংশই এখানে জাতীয় পার্টির বাইরে বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছেন।

রংপুর-৪ আসন, পীরগাছা ও কাউনিয়া নিয়ে গঠিত, সেখানে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপির শিল্পপতি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন সংক্রান্ত বক্তব্যের কারণে বিতর্কিত হলেও সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন। এনসিপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ আখতার হোসেন এই আসনে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। জামায়াতে ইসলামী কৌশলগতভাবে এই আসনে প্রার্থী না দিয়ে আখতার হোসেনকে সমর্থন করছে, যা ভোটের হিসাব-নিকাশে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলও মাঠে থাকলেও মূল লড়াই বিএনপি ও এনসিপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে উঠছে।

রংপুর-৫ আসন, মিঠাপুকুর, এখানে জামায়াতে ইসলামী শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সদস্য অধ্যাপক গোলাম রব্বানী দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপি থেকেও একই নামের প্রার্থী গোলাম রব্বানী মনোনয়ন পেয়েছেন, যা ভোটারদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। জাতীয় পার্টির শিল্পপতি প্রার্থী ফখরুজ্জামানও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন। তবে সামগ্রিকভাবে এই আসনে জামায়াতকে এগিয়ে রাখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রংপুর-৬ আসন, পীরগঞ্জ, ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। শেখ হাসিনার স্বামীর এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন এখান থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়েছেন। এবার বিএনপি থেকে জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম ব্যক্তিগত ইমেজ ও সাংগঠনিক শক্তির কারণে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে মাওলানা নুরুল আমিন জুলাই বিপ্লবে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এই আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

সব মিলিয়ে রংপুরের ছয়টি আসনেই এবার ভোটের মাঠে স্পষ্ট পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দীর্ঘদিনের একচেটিয়া রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে ভোটাররা নতুন নেতৃত্ব ও ভিন্ন ধারার রাজনীতি দেখতে চান। তরুণ ও নারী ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠিত কাজ জামায়াতে ইসলামীকে এই নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যালটের রায়ে কারা বিজয়ী হবেন, তা নির্ভর করবে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় তার ওপর।

এই প্রতিবেদনটি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্য, আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে। সংবাদটি প্রকাশে পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পাঠক-আকর্ষণীয় ও মানবিক উপস্থাপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত