প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে যখন মাঠের প্রস্তুতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দর্শক উন্মাদনার আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই মাঠের বাইরের রাজনীতি বিশ্বকাপের পরিবেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন ব্রিটেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পার্লামেন্ট সদস্যরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও প্লাইড কামরুর মোট ২৩ জন এমপি এই দাবিতে একমত হয়েছেন।
ব্রিটিশ এমপিদের এই দাবির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরগুলোকে কোনোভাবেই শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না। বিশ্বকাপ কিংবা অলিম্পিকের মতো টুর্নামেন্ট মানবিক মূল্যবোধ, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক—সেখানে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গকারী রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের এক ঝটিকা অভিযানের ঘটনা এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এ ঘটনাকে সরাসরি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ এমপিরা বলছেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অন্য দেশের ভূখণ্ড থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক দেশকে হুমকি, সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের কারণে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্রিটিশ এমপিদের দাবি, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বকাপের আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে রাখা ফিফার নৈতিক অবস্থানকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
বিতর্কের আরেকটি দিক হলো, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ফিফার কাছ থেকে একটি ‘শান্তি পুরস্কার’ গ্রহণ করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও হুমকির খবর সামনে আসায় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ভেনেজুয়েলার পাশাপাশি নাইজেরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর অভিযোগ, গ্রিনল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ইরানকে ঘিরে হুমকির বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
বিশেষ করে মেক্সিকোকে নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর, কারণ দেশটি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সহ-আয়োজক। এমন অবস্থায় আয়োজক দেশগুলোর একটির বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি বিশ্বকাপের নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। ব্রিটিশ এমপিরা মনে করছেন, যদি ফিফা এখনই শক্ত অবস্থান না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরগুলো রাজনৈতিক চাপ ও শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হতে পারে।
২৩ জন এমপি যে প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে—বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট কোনো রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন বা আগ্রাসী নীতিকে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যম হতে পারে না। তারা ফিফার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের কথাও বিবেচনায় আনার দাবি তুলেছেন তারা।
তবে এই দাবির বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফিফা একটি স্বায়ত্তশাসিত আন্তর্জাতিক সংস্থা হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ উপেক্ষা করা তাদের জন্য সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের অন্যতম বড় বাজার, স্পন্সরশিপ, সম্প্রচার স্বত্ব এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের দিক থেকে দেশটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ব্রিটিশ এমপিদের দাবি বাস্তবায়িত হলে ফিফাকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
অন্যদিকে ফুটবলপ্রেমীদের একটি বড় অংশ এই বিতর্কে বিভ্রান্ত। তারা মনে করছেন, মাঠের খেলাকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক বিশ্বে ক্রীড়া ও রাজনীতি পুরোপুরি আলাদা রাখা আর সম্ভব নয়। বিশ্বকাপের মতো আসর বিশ্বব্যাপী যে বার্তা দেয়, তা শুধু খেলাধুলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা নৈতিকতা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিফলনও বহন করে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের দাবি শেষ পর্যন্ত কতদূর এগোয়, ফিফা কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিশ্ব ফুটবল কোন পথে হাঁটে—সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে এ নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন ধীরে ধীরে বাড়ছে, তখন এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ফুটবলপ্রেমীদের আনন্দে ছায়া ফেলছে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরের এই লড়াই বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।