ড্রোন অনুপ্রবেশে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার দক্ষিণ কোরিয়ার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮ বার
দক্ষিণ কোরিয়া ড্রোন অনুপ্রবেশ আইনি পদক্ষেপ

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক একটি ড্রোন অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। যদিও সিউল স্পষ্টভাবে দাবি করেছে, এই ড্রোন অনুপ্রবেশের সঙ্গে দেশটির সামরিক বাহিনী বা সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। তবে বেসামরিক পর্যায় থেকে এ ঘটনা ঘটতে পারে— এমন সম্ভাবনাও তারা নাকচ করছে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সামরিক ও বেসামরিক উভয় দিক থেকেই তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, উত্তর কোরিয়ার অভিযোগ অনুযায়ী চলতি মাসের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে একটি ড্রোন অভিন্ন সীমান্ত অতিক্রম করে কায়েসং শহরে প্রবেশ করে। পিয়ংইয়ংয়ের দাবি, অনুপ্রবেশকারী ওই ড্রোনটি তারা ভূপাতিত করেছে এবং এর ধ্বংসাবশেষের ছবি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছে। উত্তর কোরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনা শুধু তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন নয়, বরং কোরীয় যুদ্ধের অস্ত্রবিরতি চুক্তিরও সরাসরি লঙ্ঘন।

ঘটনার পরপরই উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের বোন এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রী কিম ইয়ো জং কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের ‘উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের’ জন্য দক্ষিণ কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, যদি এই ঘটনার যথাযথ ব্যাখ্যা ও দায় স্বীকার না করা হয়, তবে উত্তর কোরিয়া পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। সিউলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনো সামরিক অভিযান কিংবা সরকারি নির্দেশে এমন ড্রোন পাঠানো হয়নি। বরং এটি কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ হতে পারে— এমন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উই সুং-ল্যাক জাপানের নারা শহরে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নেতাদের শীর্ষ বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো বেসামরিক ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তর কোরিয়ার আকাশসীমায় ড্রোন পাঠিয়েছে, তবে তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উই সুং-ল্যাক আরও বলেন, ড্রোন অনুপ্রবেশ কেবল একপাক্ষিক ঘটনা নয়। অতীতে উত্তর কোরিয়াও একাধিকবার দক্ষিণ কোরিয়ার ভূখণ্ডে ড্রোন পাঠিয়েছে। এমনকি কিছু ড্রোন সিউলের ব্লু হাউস এবং ইয়ংসান এলাকার কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেসব ঘটনাও অস্ত্রবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, “এই অঞ্চলে যে কোনো ধরনের ড্রোন অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এবং ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়ায়।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোরীয় উপদ্বীপে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রযুক্তি সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই সহজলভ্য হওয়ায় ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এমন কর্মকাণ্ড দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এই ঘটনার পরপরই সামরিক বাহিনী ও পুলিশের যৌথ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ড্রোন অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা কেবল নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি। প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, যদি কোনো বেসামরিক ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেটিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া আজও কারিগরি অর্থে যুদ্ধে রয়েছে। এই বাস্তবতায় সীমান্ত এলাকায় যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রোন অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, যা দুই দেশের জন্যই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক মহলেও এ ঘটনার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। এমন পরিস্থিতিতে ড্রোন অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের অঙ্গীকার উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে, যদি তা বাস্তবায়নে আন্তরিকতা দেখানো হয়।

একই সঙ্গে মানবিক দিক থেকেও এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসরত সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছে। সামান্য একটি ড্রোন অনুপ্রবেশও তাদের মনে নতুন করে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। তাই রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাবের বাইরে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

সব মিলিয়ে, উত্তর কোরিয়ায় ড্রোন অনুপ্রবেশের অভিযোগ কোরীয় উপদ্বীপের নাজুক বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার এবং যৌথ তদন্তের ঘোষণা আপাতত উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে পারে। তবে এই ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে এবং দুই কোরিয়ার সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে— তা নির্ভর করছে তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত