গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও দূরত্ব ঘোচেনি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭ বার
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্ক বৈঠক

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনার আবহে বুধবার ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউজে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বহুল আলোচিত এই ইস্যুতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি আসেনি। বরং আলোচনার পরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের অবস্থান এখনো ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ঘণ্টারও কম সময় স্থায়ী এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অপরদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। বৈঠকটি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হয় এবং আলোচনার বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

ডেনমার্কের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ডিআর জানিয়েছে, বৈঠক শেষে ডেনিশ কর্মকর্তারা আলোচনাকে “ইতিবাচক পরিবেশে” হয়েছে বলে উল্লেখ করলেও বাস্তবতা হলো—মূল মতভেদ রয়ে গেছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে একটি কার্যকর পথ খুঁজে বের করাই ছিল তার প্রধান উদ্দেশ্য। তবে তিনি স্বীকার করেন, আলোচনার পরও গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কাটেনি।

রাসমুসেন জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকের প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নিজের অবস্থান আগের মতোই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু ডেনমার্কের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। এই ইস্যুতে দুই দেশ আদৌ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ডেনমার্কের এই শীর্ষ কূটনীতিক।

গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মোটজফেল্ড বৈঠকের পর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যেতে চায় না। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে গ্রিনল্যান্ড আগ্রহী, তবে সেই সম্পর্ক মিত্রতার ভিত্তিতে—মালিকানার প্রশ্নে নয়। তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা মানেই আমাদের ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া নয়।”

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীও একই সুরে কথা বলেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, গ্রিনল্যান্ড দখল করা বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “একেবারেই প্রয়োজনীয় নয়”। পাশাপাশি তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সেই যুক্তিও নাকচ করেন, যেখানে বলা হচ্ছে—রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা জরুরি। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর মতে, বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের প্রতি এমন কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকি নেই, যা এই ধরনের পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়।

বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে আবারও কড়া অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন। ট্রাম্প বলেন, প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলে নেটো আরও শক্তিশালী হবে।

ডেনমার্কের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি ট্রাম্প। তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে মন্তব্য করেন, “দুটি স্লেজ কুকুর দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না; এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রই করতে পারে।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয় দেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ডেনিশ সরকার এই বক্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘অবমাননাকর’ বলে অভিহিত করেছে।

গ্রিনল্যান্ড সরকার এবং ডেনমার্ক দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে আসছে। তারা বারবার জানিয়ে দিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয় এবং শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া ‘বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ’। এই অবস্থানের অংশ হিসেবেই ডেনমার্ক ২০২৬ সাল জুড়ে আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।

ডেনিশ সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে নেটোর মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে বিমান, জাহাজ ও সেনা মোতায়েন করা হবে। এই উদ্যোগে জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন ও নরওয়ে অংশ নিচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—আর্কটিক অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সম্ভাব্য যেকোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, সুইডেন ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠানো শুরু করেছে। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিসটারসন জানিয়েছেন, এটি মিত্র দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগের অংশ। তবে কতজন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা জানাননি। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডেনমার্কের ‘অপারেশন আর্কটিক এনডিওরেন্স’ মহড়ার আওতায় ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই মোতায়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি এখন আর কেবল একটি দ্বীপের মালিকানা বা নিরাপত্তা প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো এবং আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য জড়িয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় জনগণ নিজেদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা আশঙ্কা করছে, পরাশক্তিগুলোর টানাপোড়েনে তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের নেতারা বারবার বলছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সেখানকার জনগণেরই।

সব মিলিয়ে, হোয়াইট হাউজের রুদ্ধদ্বার বৈঠক গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তব সমাধান এখনও দূরে। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে মতভেদ অব্যাহত থাকায় এই ইস্যু আগামী দিনগুলোতেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত