নির্বাচনের মুখে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে বাড়ছে তিক্ততা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তিক্ততা

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক সাধারণতই জটিল হয়ে থাকে। ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি ও অভিন্ন স্বার্থ—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক কখনো ঘনিষ্ঠ, কখনো টানাপোড়েনের। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও তার ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, ভাষা ও সংস্কৃতির মিল, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে এই দুই দেশের সম্পর্ক একটি স্পষ্ট সংকটকাল অতিক্রম করছে। যে রাজনৈতিক মতানৈক্য একসময় কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন বড় ধরনের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। এমনকি এই উত্তেজনার আঁচ পৌঁছেছে খেলার মাঠেও, যা দুই দেশের জনগণের আবেগকে আরও উসকে দিচ্ছে।

এই টানাপোড়েনের সূচনা হয় প্রায় এক বছর আগে। বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। নয়াদিল্লি তাকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখত এবং কূটনৈতিকভাবে শক্ত সমর্থন দিয়ে এসেছে। কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ব্যাপক ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হলে সেই সম্পর্কের ভিত্তি নড়ে যায়। আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার শাসনকে স্বৈরাচারী বলে আখ্যা দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা দমন-পীড়ন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তরুণ প্রজন্ম। শেষ পর্যন্ত এই গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে নিরাপত্তার জন্য ভারতে আশ্রয় নেন।

এই ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চায়। কিন্তু ভারত তাকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বড় একটি অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। অনেকের চোখে এটি ছিল বাংলাদেশের জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা। ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র আকার ধারণ করে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে পারস্পরিক অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগে। ভারত অভিযোগ করে, ঢাকা ক্রমাগত কড়া ভাষায় বিবৃতি দিচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নয়াদিল্লি। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ভারতের দাবি ছিল, তাদের কূটনৈতিক মিশন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে হিন্দু ডানপন্থি গোষ্ঠীর বিক্ষোভের পর ঢাকা এই সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই রেশ গড়ায় খেলার মাঠেও। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়; এটি আবেগ, জাতীয়তাবোধ ও গর্বের প্রতীক। ভারতের ডানপন্থি কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করে। এর জেরে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ থেকে একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ ঘোষণা দেয়, তারা আগামী মাসে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলতে ভারতে যাবে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কাছেও ম্যাচ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত এক ধরনের ক্রীড়া বয়কট, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রার সংকেত দেয়।

এই সম্পর্ক এত দ্রুত মেরামত করা কেন কঠিন হয়ে উঠেছে—এর মূল কারণ লুকিয়ে আছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশেই সামনে নির্বাচন। ভারতে সরকার নিজেদের শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিবর্তন তারা কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলও নয়াদিল্লিকে চিন্তিত করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। শেখ হাসিনার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ধস নামে। ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ায় চরমপন্থি শক্তিগুলো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। দেশটি এক ধরনের পরিচয় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ভারতকে কখনো বন্ধু, কখনো সন্দেহজনক প্রতিবেশী হিসেবে দেখেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সেই স্মৃতি তরুণ প্রজন্মের কাছে ততটা প্রভাব ফেলছে না।

তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি আগের প্রজন্মের থেকে আলাদা। তারা শেখ হাসিনাকে স্বৈরশাসক হিসেবে দেখেছে এবং বিশ্বাস করে, তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ভারত ভূমিকা রেখেছে। তার শাসনামলে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করা হয়েছে, বহু মানুষ গুম ও হত্যার শিকার হয়েছে। চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যু তরুণদের ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতি অবিশ্বাস গভীর হয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশের নির্বাচনে এই মনোভাব বড় প্রভাব ফেলছে। শেখ হাসিনার দল কার্যত নির্বাচনের বাইরে। নতুন ও পুরোনো অনেক প্রার্থী ভোট টানতে ভারতবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ ভারতের ‘হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলছেন। এই বক্তব্যের সঙ্গে কখনো ধর্মীয় চরমপন্থাও যুক্ত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সংকটের মাঝেই দায়িত্ব নিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তির সামনে চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে আন্দোলনকারী তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো এবং ভারত থেকে আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ভারত এসব অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম ড. ইউনূসকে চরমপন্থিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে তুলে ধরছে। হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি যথেষ্ট করছেন না—এমন অভিযোগও তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, সহিংসতা কোনো একটি গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়, বরং সামগ্রিক অস্থিরতার ফল। তারা পাল্টা অভিযোগ করছে, ভারতীয় মিডিয়া রাজনৈতিক স্বার্থে বিষয়গুলো অতিরঞ্জিত করছে।

বাংলাদেশের হিন্দুদের ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম—এই দুই রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে প্রায় ১৪ কোটি মানুষ বাস করে। এই রাজ্যগুলোর নির্বাচন সামনে থাকায় স্থানীয় রাজনীতিকরা বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিছু নেতার উসকানিমূলক বক্তব্য কূটনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করছে।

তবে এই উত্তেজনার মধ্যেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা থেমে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ঢাকা সফর এবং বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এই ইঙ্গিতই দেয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারতের জন্য এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল জরুরি। বাংলাদেশে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা গভীর এবং প্রজন্মগত। শুধু স্বল্পমেয়াদি স্বার্থ দেখে সিদ্ধান্ত নিলে ভারতেরই ক্ষতি হতে পারে। বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য দুই দেশেরই একে অপরকে প্রয়োজন। কিন্তু আপাতত রাজনীতি ও ক্ষোভ সেই পথকে কঠিন করে তুলেছে। আসন্ন নির্বাচন অনেক কিছু নির্ধারণ করবে। ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক অস্থির ও উত্তেজনাপূর্ণই থাকবে—এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত