অনুগত ইরানি ব্যবসায়ীরা কেন এখন রাজপথে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬ বার
অনুগত ইরানি ব্যবসায়ীরা কেন এখন রাজপথে

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের রাজনৈতিক অভিধানে ‘বাজার’ শুধু একটি বাণিজ্যিক স্থান নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক শক্তির নাম। কয়েক দশক ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে অনুগত সামাজিক ভিত্তিগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল এই বাজার ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী শ্রেণি। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাজপথে যখন বিক্ষোভের ঢেউ উঠেছে, তখন সেই চেনা বাজারকেই দেখা যাচ্ছে আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে। যে শ্রেণিকে এতদিন শাসকগোষ্ঠী নিজেদের নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করত, তারাই এখন কেন রাজপথে নেমে প্রতিবাদের ভাষা বেছে নিচ্ছে—এই প্রশ্নই ইরানের বর্তমান অস্থিরতার গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

গণবিক্ষোভ শুরুর পর প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি চেষ্টা করেছিলেন বাজারের ‘ন্যায়সংগত’ অভিযোগ আর দেশজুড়ে চলমান রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টানতে। তিনি বলেছিলেন, প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথা বলা যায়, কিন্তু দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে নয়। একই সঙ্গে তিনি বাজার ও ব্যবসায়ীদের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘সবচেয়ে অনুগত অংশগুলোর একটি’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, রাষ্ট্রের শত্রুরা বাজারকে ব্যবহার করে সরকারবিরোধী কোনো চ্যালেঞ্জ দাঁড় করাতে পারবে না। এই বক্তব্যে বাজারকে আন্দোলনের মূল স্রোত থেকে আলাদা করার একটি সচেতন রাজনৈতিক প্রচেষ্টা স্পষ্ট ছিল।

কিন্তু বাস্তবতা সেই বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না। তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজারে একের পর এক ধর্মঘট, দোকান বন্ধ, রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার দেখিয়েছে যে বাজারকে আর বৃহত্তর অস্থিরতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাচ্ছে না। এমনকি কিছু বিক্ষোভে সর্বোচ্চ নেতার পতনের দাবিও উঠেছে। রাষ্ট্রের ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তাই মাঠপর্যায়ে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাজারের এই ভূমিকার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে বাজার ছিল অন্যতম চালিকাশক্তি। মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় আলেমদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাজার ব্যবসায়ীরাই অর্থনৈতিক সহায়তা ও সাংগঠনিক শক্তি জুগিয়েছিল। বিপ্লবের পরের দশকগুলোতে এই আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে তারা রাষ্ট্রের ভেতরে শক্ত অবস্থান পায়। ইসলামি কোয়ালিশন পার্টির মাধ্যমে বাজারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা মন্ত্রিসভা, মজলিস, গার্ডিয়ান কাউন্সিলসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে। আশির দশকে আমদানি লাইসেন্স, সরকার-নির্ধারিত কম বিনিময় হার ও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার তাদের বিপুল মুনাফার সুযোগ করে দেয়।

নব্বইয়ের দশকে রাষ্ট্রপতি আকবর হাশেমি রাফসানজানির অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতিতেও বাজার পুরোপুরি কোণঠাসা হয়নি। বরং ঐতিহ্যবাহী ডানপন্থি শক্তি হিসেবে তারা নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়। মোহাম্মদ খাতামির সংস্কারবাদী আমলেও বিচার বিভাগ ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রভাব বজায় থাকে। ফলে বাজার তখনো রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবেই বিবেচিত ছিল।

এই সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের উত্থানের পর। শুরুতে বাজার তার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থিতাকে সমর্থন দিলেও, তার শাসনামলের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত বাজারের অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। তথাকথিত বেসরকারীকরণ কার্যত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও বিভিন্ন বিপ্লবী ফাউন্ডেশন বা বনিয়াদের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদের নতুন ব্যাখ্যার মাধ্যমে এসব সংস্থাকে ‘সরকারি হলেও অ-সরকারি’ সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তাদের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেয়।

আইআরজিসি ধীরে ধীরে অবকাঠামো, পেট্রোকেমিক্যাল, ব্যাংকিং ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হয়। মোস্তাজাফান ফাউন্ডেশন, ইমাম রেজা দরগাহ ফাউন্ডেশন ও সেটাদের মতো বনিয়াদগুলো বিশাল করপোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই সামরিক-বিপ্লবী কংগ্লোমারেটের উত্থান সরাসরি বাজার ও তার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক মিত্রদের ক্ষতির বিনিময়ে ঘটে। ২০০৮ সালে তাই বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো বাজার ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্য ধর্মঘটে নামেন।

পরিস্থিতি আরো জটিল হয় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। আহমাদিনেজাদের পারমাণবিক নীতির জেরে ২০১২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তেল ও ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা এবং সুইফট ব্যবস্থা থেকে ইরানের বহিষ্কার দেশটির অর্থনীতিকে চরম চাপে ফেলে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে যে ছায়া অর্থনীতি গড়ে ওঠে, সেখানে আইআরজিসি তাদের নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়। এতে তারা আরও শক্তিশালী হয়, আর বাজার ক্রমশ প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফলই আজকের অসন্তোষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতিত্বে বাজার ব্যবসায়ীরা নিজেদের ঐতিহ্যগত সুবিধা হারিয়েছে। একসময় যে বাজার ছিল শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতার প্রতীক, সেটিই এখন অকার্যকারিতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

বর্তমান বাজারকেন্দ্রিক বিক্ষোভ তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরেরই প্রকাশ। খামেনির বক্তব্যে বাজারের আনুগত্যের ওপর জোর দেওয়া আসলে আত্মবিশ্বাসের চেয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ বাজারের প্রকাশ্য অবাধ্যতা দেখাচ্ছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ঐতিহ্যগত সামাজিক ভিত্তিও এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নেই।

তাত্ত্বিকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং আইআরজিসি ও বনিয়াদগুলোর আধিপত্য কমিয়ে রাষ্ট্র বাজারকে ফেরাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ছে, আর সামরিক-বিপ্লবী অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙার রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নেই। ফলে শাসকগোষ্ঠীর সামনে কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হয়ে এসেছে। দমননীতি তাই সবচেয়ে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে, যদিও এতে একসময় সবচেয়ে অনুগত বলে বিবেচিত বাজার শ্রেণিও আরো দূরে সরে যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে অনুগত ইরানি ব্যবসায়ীদের রাজপথে নামা শুধু অর্থনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। বাজারের এই পরিবর্তিত ভূমিকা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জটিল এবং অনিশ্চিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত