প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা ছয় ধরনের ভাতার হার নতুন করে নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বয়স্ক ভাতা থেকে শুরু করে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী, প্রতিবন্ধী, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি এবং অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি—এই সব খাতে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ভাতার পরিমাণ বাস্তব জীবনের ব্যয়ের সঙ্গে আর সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ ছিল উপকারভোগীদের। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ একটি আন্তমন্ত্রণালয় কার্যকরী কমিটি গঠন করেছে, যা ভাতাগুলোর হার সময়োপযোগী করতে সুপারিশ দেবে।
অর্থ বিভাগের জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী, ছয় ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার নতুন হার নির্ধারণে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও সামষ্টিক অনুবিভাগ) মো. হাসানুল মতিন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কমিটি যে সুপারিশ দেবে, তা অনুমোদিত হলে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন হার কার্যকর হবে।
সরকারি সূত্র জানায়, ভাতার হার বাড়ানো হবে কি না, বাড়ালে কতটা বাড়ানো হবে কিংবা কোনো ক্ষেত্রে হার অপরিবর্তিত থাকবে কি না—এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে গঠিত সামাজিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে। আগামী ২১ জানুয়ারি সচিবালয়ে এই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ বিভাগের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, নতুন গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি উপদেষ্টা পরিষদ কমিটিকে তথ্য, বিশ্লেষণ ও সুপারিশ দিয়ে সহায়তা করবে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাস্তবসম্মত ও তথ্যভিত্তিক হয়।
এই কমিটির কর্মপরিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ছয় ধরনের ভাতার হার নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে পর্যালোচনা করা হবে এবং এই হার নির্ধারণে প্রধান অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হবে ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই। অর্থাৎ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে ভাতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো স্বয়ংক্রিয় বা নিয়মিত পদ্ধতি না থাকায় উপকারভোগীরা যে ক্ষতির মুখে পড়ছিলেন, এই উদ্যোগ তার একটি কাঠামোগত সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কমিটি বছরে অন্তত একবার ভাতার হার পর্যালোচনা করবে এবং এ বিষয়ে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন অর্থসচিবের কাছে দাখিল করবে। অর্থসচিব পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিবেদন সামাজিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সামনে উপস্থাপন করবেন। প্রয়োজনে কমিটি এক বা একাধিক সদস্যকে কো-অপ্ট করতে পারবে, যাতে বিশেষজ্ঞ মতামত বা অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ সহজ হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই উদ্যোগ একেবারে নতুন নয়। এর আগে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর একই উদ্দেশ্যে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল অর্থ বিভাগ। তবে সেটি পরে বাতিল করা হয়েছে এবং এবার আরও বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হলো। যদিও আগের কমিটি ও বর্তমান কমিটির কর্মপরিধি একই রাখা হয়েছে, তবু সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সদস্য সংখ্যা বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও বাস্তবসম্মত করবে।
নতুন কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে একজন করে যুগ্ম সচিব অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের একজন যুগ্ম প্রধান এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে একজন করে পরিচালক কমিটির সদস্য হিসেবে থাকবেন। অর্থ বিভাগের একজন উপসচিব কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। এবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে একজন করে নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া ভাতার হার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী এবং বয়স্ক ভাতার পরিমাণ মাসে ৬৫০ টাকা, যা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করলে অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করেন উপকারভোগীরা। প্রতিবন্ধী ভাতার হার মাসে ৯০০ টাকা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় মাসিক ভাতা ৮৫০ টাকা। এসব অর্থ দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাত্রা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি পেনশন বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। পেনশন বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অন্যান্য কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ দাঁড়ায় ৮১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। এই অর্থ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা ভাতাগুলো শুধু দয়ার অনুদান নয়, বরং রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও যদি ভাতার হার অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে প্রকৃত অর্থে উপকারভোগীরা প্রতি বছরই কম সহায়তা পাচ্ছেন। ফলে ভাতার নিয়মিত ও স্বচ্ছ পর্যালোচনার উদ্যোগ সময়োপযোগী বলে মনে করছেন তাঁরা।
তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, শুধু ভাতার হার বাড়ালেই কি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অপচয় রোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নইলে বরাদ্দ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
সরকারি মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কমিটির কাজের মাধ্যমে ভাতার হার নির্ধারণে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতেও ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করা যাবে। এতে করে হঠাৎ সিদ্ধান্তের বদলে তথ্যভিত্তিক ও মূল্যস্ফীতিসংগত ভাতা নির্ধারণ সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে ছয় ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার নতুন হার নির্ধারণে কমিটি গঠনের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার ওপর। তবে দীর্ঘদিন পর ভাতা পর্যালোচনার এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় উপকারভোগীদের মধ্যে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।