প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা কারওয়ান বাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক তৎপরতার অভাবে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও চাঁদাবাজি প্রবল হয়ে উঠেছে। সড়কের পুরো অংশ জুড়ে ভ্রাম্যমাণ দোকান, ফুটপাত দখল এবং উন্মুক্ত ড্রেন থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। এখানে বর্জ্য ও আবর্জনার স্তূপ যেন রাস্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। বছরের কোনো সময়েই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। শীতকালে কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বর্ষার সময় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে আইনশৃঙ্খলা ও সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম কার্যকরভাবে চলতে পারছে না, যার ফলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে ভুগছেন।
কারওয়ান বাজার ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এটি দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার। সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান, বহুতল ভবন এবং বিপুল সংখ্যক মার্কেট এখানে অবস্থান করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ ও ২ নম্বর মার্কেট, কিচেন মার্কেট, সিটি করপোরেশন আড়ৎ ভবন, ডিআইটি মার্কেট, কাব্যকস সুপার মার্কেট, উত্তর কারওয়ান বাজারসহ আরও প্রায় ১০ থেকে ১২টি মার্কেট ও আড়ৎ এখানে বিস্তৃত। এসব মার্কেটের চারপাশের ফুটপাত ও সড়ক জুড়ে তৈরি হয়েছে দোকানপাট। ফুটপাত ছাড়াও কয়েকটি স্থানে পুরো সড়কজুড়ে অবৈধ মার্কেট বসেছে। পেট্রোবাংলা থেকে শুরু করে নানা অলি-গলিতে চলছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং, যা যান চলাচলে তীব্র বাধা সৃষ্টি করছে।
রাস্তার অবস্থা প্রায়ই বেহাল থাকে। যানজট, কাদা, বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়া এবং ময়লার স্তূপ এখানে সাধারণ। অব্যবস্থাপনার কারণে পথচারীকে চলতে হয় বিপজ্জনক পরিবেশে। পার্কিং-এর অব্যবস্থাও গুরুতর সমস্যা তৈরি করেছে। সরকারি-বেসরকারি ভবনের সামনে সড়কের দুই পাশে গাড়ি পার্কিং এবং ব্যক্তিগত গাড়ি রাখার কারণে প্রধান সড়কের যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অলি-গলির ভেতর এমন অবস্থা আরও গুরুতর।
ময়লা-আবর্জনার পরিস্থিতিও ভোগান্তিকর। যেখানে-সেখানে ময়লার স্তূপ এবং বর্জ্য কনটেইনার রাস্তার ওপর রাখা থাকায় দুর্গন্ধ এবং যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। আবর্জনার কারণে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, পণ্য খালাসের পর ব্যবসায়ীরা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে দিয়ে যান। বর্জ্য কন্টেইনার ব্যবহারের নিয়ম না মানায় রাস্তা কাদা ও দুর্গন্ধময় হয়ে পড়ছে।
ব্যবসায়ীদের একাধিক সমিতির নেতা অভিযোগ করেন, দুই মাস আগে ছয়টি রাস্তা সংস্কারের জন্য প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও এখনো কাজ হয়নি। আড়তের ভেতরের রাস্তা থেকে তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত বৃষ্টিতেই রাস্তা খালে পরিণত হয়। ভাঙা ম্যানহোলও বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করে। চাঁদাবাজির অভিযোগও গোপন নয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিটি করপোরেশন পণ্য খালাসের সময় নিয়মিত নজরদারি করলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব।
কারওয়ান বাজারে নীতি ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সিটি করপোরেশন অবশ্য পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানান, খুব শিগগিরই ম্যাজেস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে আইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে বাস্তবে প্রশাসনিক তৎপরতার অভাবে চাঁদাবাজি ও ফুটপাত দখলের সমস্যা এখনও সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে না।
কারওয়ান বাজারের এই অব্যবস্থাপনা কেবল ব্যবসায়ী ও পথচারীর জন্য সমস্যার সৃষ্টি করছে না, বরং এটি শহরের বাণিজ্যিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কেবল বাণিজ্যিক কার্যক্রমের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নাগরিক ও ব্যবসায়ী উভয়ের সহযোগিতা ছাড়া এটি বাস্তবায়ন কঠিন। প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।