প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানুষের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হলো কিডনি। প্রতিদিন আমাদের রক্ত পরিশোধন, শরীর থেকে বর্জ্য ও টক্সিন বের করে দেওয়া, ইলেক্ট্রোলাইট ও তরলের ভারসাম্য রক্ষা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মতো জটিল কাজ নীরবে করে যায় এই দুটি অঙ্গ। অথচ দৈনন্দিন জীবনে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, অতিরিক্ত লবণ ও প্রসেসড খাবার গ্রহণ, ধূমপান কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে কিডনির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি সুস্থ রাখতে ও দীর্ঘমেয়াদে জটিল রোগ এড়াতে পানীয় নির্বাচনে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে এমন কিছু প্রাকৃতিক পানীয়ের কথা উঠে এসেছে, যেগুলো নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীর থেকে টক্সিন বের হতে সাহায্য করে এবং কিডনির কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তবে এগুলো কোনো ওষুধ নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই বুদ্ধিমানের। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, সঠিক পানীয় নির্বাচন কিডনির সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে যাঁরা এখনো কিডনি রোগে আক্রান্ত নন।
কিডনি ভালো রাখতে যে পানীয়গুলোর কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়, তার মধ্যে প্রথমেই আসে লেবু পানি। সাধারণ পানি পান করা যেমন জরুরি, তেমনি তাতে সামান্য লেবুর রস যোগ করলে উপকারিতা আরও বেড়ে যায়। লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড প্রস্রাবে সাইট্রেটের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে, যা কিডনিতে পাথর তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত লেবু পানি পান করলে প্রস্রাবের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে এবং শরীরে জমে থাকা কিছু ক্ষতিকর বর্জ্য সহজে বের হয়ে আসে। তবে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, লেবু পানিতে কোনো অবস্থাতেই চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টি যোগ করা উচিত নয়। সকালে খালি পেটে বা দুপুরে খাবারের পর এক গ্লাস লেবু পানি কিডনির জন্য উপকারী হতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত খেলে গ্যাস্ট্রিক বা দাঁতের এনামেলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
দ্বিতীয় যে পানীয়টি কিডনির জন্য বেশ উপকারী বলে বিবেচিত, তা হলো নারকেল পানি। প্রাকৃতিক এই পানীয়টি ইলেক্ট্রোলাইটে সমৃদ্ধ এবং শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করতে সাহায্য করে। গরম আবহাওয়া বা অতিরিক্ত ঘাম হলে শরীর থেকে যে লবণ ও খনিজ উপাদান বেরিয়ে যায়, নারকেল পানি তা অনেকাংশে পূরণ করতে পারে। কিডনির জন্য এর একটি বড় সুবিধা হলো, এটি শরীরে অপ্রয়োজনীয় সোডিয়াম জমতে দেয় না এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য বের করতে সহায়তা করে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে নারকেল পানি পান করলে কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় থাকে। তবে যাঁদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি বা কিডনি রোগের জটিলতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নারকেল পানি গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তৃতীয় যে পানীয়টির কথা প্রাচীনকাল থেকেই কিডনির জন্য উপকারী হিসেবে পরিচিত, তা হলো জবের পানি। জব বা বরই জাতীয় এই ফল শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং প্রস্রাবের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক বলে আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় উল্লেখ রয়েছে। জবের পানিতে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হালকা ডাইইউরেটিক হিসেবে কাজ করে, যার ফলে প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য ও টক্সিন বের হতে সুবিধা হয়। গরমকালে জবের পানি পান করলে শরীর যেমন আরাম পায়, তেমনি কিডনির ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে না। তবে যেকোনো ভেষজ বা প্রাকৃতিক পানীয়ের মতো এটিও পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করাই উত্তম।
চতুর্থ পানীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা শসার পানির কথা উল্লেখ করেন। শসা প্রাকৃতিকভাবে পানিসমৃদ্ধ একটি সবজি, যা শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে। শসার পানিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রাকৃতিক ডাইইউরেটিক উপাদান প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে শরীর থেকে বর্জ্য বের করতে সহায়তা করে। শসা কেটে পানিতে ভিজিয়ে কিছুক্ষণ রেখে সেই পানি পান করলে শরীর সতেজ থাকে এবং কিডনির কাজ সহজ হয়। নিয়মিত শসার পানি পান করা গেলে শরীরে পানি স্বল্পতার ঝুঁকি কমে, যা কিডনি সুস্থ রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কিডনি ভালো রাখার ক্ষেত্রে শুধু উপকারী পানীয় গ্রহণই যথেষ্ট নয়, বরং কিছু পানীয় থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকাও জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত চা, কফি, কোমল পানীয় কিংবা এনার্জি ড্রিংক কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এসব পানীয়ে থাকা ক্যাফেইন, চিনি ও কৃত্রিম উপাদান কিডনির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত সফট ড্রিংক গ্রহণ কিডনিতে পাথর ও অন্যান্য জটিলতার সম্ভাবনা বাড়ায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যাঁরা ইতিমধ্যে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা কিডনি–সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে যেকোনো পানীয় গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেক সময় বেশি পানি বা নির্দিষ্ট কিছু পানীয় কিডনি রোগীর জন্য উপকারী না হয়ে বরং ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, বয়স ও রোগের ধরন অনুযায়ী পানীয় নির্বাচন করা জরুরি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি সুস্থ রাখতে পানীয়ের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান, লবণ ও প্রসেসড খাবার কম খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ধূমপান পরিহার করা কিডনি সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক পানীয়গুলো এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে, কোনো বিকল্প হিসেবে নয়।
সবশেষে বলা যায়, কিডনি সুস্থ রাখা মানে শুধু একটি অঙ্গকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো শরীরের ভারসাম্য ও সুস্থতাকে দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা। লেবু পানি, নারকেল পানি, জবের পানি ও শসার পানির মতো প্রাকৃতিক পানীয় নিয়মিত ও পরিমিতভাবে গ্রহণ করলে শরীর থেকে টক্সিন বের হতে সহায়তা করে এবং কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেকোনো স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সচেতনতা ও চিকিৎসকের পরামর্শই হতে পারে নিরাপদ জীবনের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।