প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায়মুক্তি অধ্যাদেশ, ২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের জন্য নতুন সুরক্ষা ও দায়মুক্তির পথ খুলতে যাচ্ছে। এই অধ্যাদেশের খসড়া আজ বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে উপস্থাপন হতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খসড়া প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সকল মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য কেউ আবেদন করতে হবে না। আইনের অন্য একটি ধারা স্পষ্টভাবে বলে, আগামী দিনেও কেউ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যুক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে না, এবং কোনো আদালত এমন মামলা গ্রহণ করবে না। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের মধ্যে যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ প্রদানের সুপারিশ করতে পারবে।
আইনের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে স্বৈরশাসক সরকারের নির্দেশে পরিচালিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনশৃঙ্খলা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আত্মরক্ষা সহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছিল অনিবার্য। আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী প্রস্তাবিত এই আইন সম্পূর্ণ বৈধ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ সালে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবিতে। আন্দোলনটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে যায় এবং সরকার পতনের এক দফার গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের ৩৬ দিনে হাজার হাজার মানুষ আহত হন এবং জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হতে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অসংখ্য মানুষ আহত হন। এই ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আইনের খসড়া তৈরি করে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে নেতৃত্ব দেওয়া ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হলেও আইনি জটিলতার কারণে এখনও কিছু মামলা অপেক্ষমাণ রয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত করেছেন। তাদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের পর এ ধরনের দায়মুক্তি আইন প্রচলিত আছে। বাংলাদেশেও সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ ও ১৯৭৩ সালের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দায়মুক্তির আইন এই খসড়াকে বৈধতা দেয়।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে শুধু অতীতের মামলাই বাতিল হবে না, ভবিষ্যতেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধ কোনো মামলা গ্রহণযোগ্য হবে না। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া চালু থাকবে, যা মানবাধিকার সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বিচারিক স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের ওপর চাপ কমানোও। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা দেশের জন্য আত্মরক্ষা করেছিলেন, তাদের প্রতি কোনো ধরনের বিচারিক হেনস্থা আর হতে পারবে না।
এই অধ্যাদেশটি পাশ হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে স্বার্থপর ও স্বৈরশাসক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী যুবকদের জন্য একটি যুগান্তকারী আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এতে শুধু রাজনৈতিক স্বার্থ নয়, দেশের ন্যায্য ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যও একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠবে।