চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু বাড়িতে অগ্নিসংযোগে আ.লীগ জড়িত অভিযোগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে একের পর এক অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অস্থিরতা সৃষ্টি করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিতে জানা গেছে, আগুন দেওয়ার আগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাড়ির মালিকদের হাতে মোট ১৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন লাগানো হয়।

রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় এসব অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ডিসেম্বর মাসে। পুলিশ ও আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে মনির হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। জবানবন্দিতে মনির হোসেন উল্লেখ করেন, মায়ের হত্যার বিচার চেয়ে প্রথমে তিনি স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কাছে যান। ওই নেতা আশ্বাস দেন যে বিচার পাওয়া যাবে, তবে এর জন্য শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।

মনিরের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তাকে রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া কিছু পেশাদার অপরাধীর সঙ্গেও তার যোগাযোগ করানো হয়, যারা মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। মনিরের জবানবন্দিতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর অংশ হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিনিময়ে তাকে এক লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি রাঙামাটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

মনির জানান, রাউজানে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের কয়েকদিন আগে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়। বৈঠকে ওই এলাকার কয়েকজন বাড়ির মালিকও উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় মূল উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে অস্থিরতা তৈরি করা এবং ভারতের মতো আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে দিয়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চাপ তৈরি করা।

অগ্নিসংযোগের কৌশল সম্পর্কে মনির আরও জানিয়েছেন, আগুন দেওয়ার আগে বাড়ির লোকজনকে সতর্ক করা হতো, যাতে কেউ হতাহত না হয় এবং পোষা প্রাণী সরিয়ে নেওয়া যায়। বাড়ির বাইরে পুরনো কাপড় ও লুঙ্গি রেখে আগুন লাগানো হতো। ক্ষতিপূরণ হিসেবে আগে থেকেই বিতরণ করা হয়েছিল ১৩ লাখ টাকা।

পুলিশ জানায়, ১৮ ডিসেম্বর রাউজানের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়া গ্রামে সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন ঢেউয়াপাড়া গ্রামে দুটি হিন্দু বসতঘরে এবং ২৩ ডিসেম্বর পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামে সুখ শীল ও অনিলের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। যদিও ঘটনাগুলোতে কেউ হতাহত হননি, তবে কয়েকটি ঘর আংশিক এবং কয়েকটি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করেছে উসকানিমূলক বক্তব্য সংবলিত ব্যানার, যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক লেখা, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর উল্লেখ ছিল। প্রতিটি ঘটনায় মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহত হয়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ ও প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে।

এই ঘটনায় তিনটি মামলা রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানায় দায়ের করা হয়েছে। ঢেউয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বিমল তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে মনিরের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা ওমর ফারুক, কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, কেরোসিন তেলের কনটেইনার, লুঙ্গি, একটি পুরনো শার্ট, মোবাইল ফোন, সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল।

রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রাতের আঁধারে এসব অগ্নিসংযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক ছিল। এ মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ব্যক্তিগত বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়েছিল।

প্রশাসনিক ও পুলিশের সূত্র বলছে, এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুধু ক্ষতিসাধনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টি করার একটি কৌশল ছিল। এখন পর্যন্ত তদন্তে ধীরে ধীরে অপরাধী চক্র ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা স্পষ্ট হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত