রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে সুপারিশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮ বার
রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে সুপারিশ

প্রকাশ:১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বাজারে রমজানকে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা গত নভেম্বরে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একক ঋণসীমা (সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট) বাড়েনি বলে আমদানিকারকদের সক্ষমতা সীমিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ অবস্থায় রমজানে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত ডলার সরবরাহের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি একক ঋণসীমা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, চাল, ডাল, গম, পিঁয়াজ, ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, মটর, খেজুর ও মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে শুল্ক ও কর কমানো উচিত। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, শীতকালে রোজা শুরু হওয়ার কারণে উৎপাদনমুখী মিল ও কারখানায় জ্বালানি সংকট হতে পারে। এর ফলে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হলে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। তাই মিল ও কারখানায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শীতকালে বাসা ও শিল্পখাতের জ্বালানি চাহিদা বেড়ে যায়। মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া, আমদানিনির্ভর পণ্যের এলসি খোলার পরও শিপমেন্ট খালাস হতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান ১২০ টাকার বেশি, যা চার বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে সেই সময়ের একক ঋণসীমার সঙ্গে তুলনা করলে এখন কম পণ্য আমদানি সম্ভব হচ্ছে।

একটি ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক কম্পানির কর্মকর্তা জানান, ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একক গ্রাহক ঋণসীমা মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল। এছাড়া ফান্ডেড ঋণের অনুমোদনের সময়কালের মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া যাবে না। সেই সময় প্রতি ডলারের মান ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। বর্তমানে টাকার মান অবমূল্যায়ন হওয়ায় আগের ঋণসীমার বিপরীতে এখন অনেক কম পণ্য আমদানি সম্ভব। এতে আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত পণ্য আনা নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।

গোয়েন্দা সংস্থা সুপারিশ করেছে, নিত্যপণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট ও উৎসে করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে সমন্বয় করা, পাইপলাইনে থাকা পণ্য দ্রুত শিপমেন্ট খালাস করা, বন্দর, শুল্ক স্টেশন ও কাস্টমস কার্যক্রম সচল রাখা, প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহের মাধ্যমে একক ঋণসীমা বাড়ানো, মিলগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রমজানে দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ বজায় রাখা। এছাড়া সরবরাহ সংকটকে অজুহাত হিসেবে মজুত বা মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধের পাশাপাশি টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সম্প্রসারণ, অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ দোকানে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা এবং দুধ, ডিম ও মাংসের সুলভমূল্যে বাজারজাতকরণ করার কথাও বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবেদনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে কিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। যেমন খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে এবং মুড়িকাটা পিঁয়াজ বাজারে আসায় দাম কিছুটা কমেছে। এছাড়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৯ জানুয়ারি রমজানকেন্দ্রিক দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য টাস্কফোর্সের বৈঠক ডেকেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রমজানের সময় নিত্যপণ্যের সরবরাহে যেকোনো ঘাটতি সরাসরি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সরকারের পরিকল্পিত পদক্ষেপ এবং বাজার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসায়ী ও বাজার কমিটি সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করলে রমজানকালে বাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী অতিরিক্ত ডলার সংস্থান, শুল্ক ও কর সমন্বয় এবং মিলগুলিতে উৎপাদন সচল রাখার ব্যবস্থা করলে রমজানকালে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। তবে ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছানো এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও জরুরি। তাছাড়া সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য প্রদান ও ইতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে ‘প্যানিক বায়িং’ প্রতিরোধ করা গেলে বাজার স্থিতিশীল থাকবে।

রমজানকে কেন্দ্র করে এই পদক্ষেপগুলো কেবল সরবরাহ সচল রাখার বিষয় নয়, এটি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, সামাজিক শান্তি বজায় রাখা এবং মূল্য স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ ও বাজার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করলে রমজানে নিত্যপণ্যের অভাব ও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত