প্রকাশ: ১৩ জুন, ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে গত বৃহস্পতিবার, ১২ জুন, এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, যা গোটা দেশকে গভীর শোক ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেয়। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট, উড্ডয়নের মাত্র পাঁচ মিনিট পরই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। উড্ডয়নের পরপরই বিমানটি ভারসাম্য হারিয়ে বাঁদিকে হেলে পড়ে এবং হঠাৎ নিচের দিকে দ্রুত নেমে আসতে থাকে। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে, বিমানের লেজের দিক নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ে, ফলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়।
দুর্ঘটনার স্থল ছিল বিমানবন্দর চত্বরসংলগ্ন মেঘানিনগর এলাকা। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে বিজে মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন ছাত্রাবাসের একটি বহুতল ভবনের ওপর, যা এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে, আহত হয়েছেন বহু মানুষ। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসা চলছে, এবং প্রশাসনের আশঙ্কা, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত সবাই গভীরভাবে ব্যথিত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় বলেন, আহমেদাবাদের এই দুর্ঘটনায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে এবং তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ রাখছেন। একইভাবে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেলও দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দেন। তিনি জানান, যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
বিমানটিতে মোট ২৪২ জন আরোহী ছিলেন—এর মধ্যে ২৩০ জন যাত্রী এবং ১২ জন বিমানকর্মী। ভারতের অসামরিক বিমান পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা পাইলটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা করা হলেও, পুরো ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা এই দুর্ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এই দুঃখজনক ঘটনার পরপরই এগিয়ে এসেছে ভারতীয় শিল্প জগতের অন্যতম বৃহৎ এবং সম্মানিত প্রতিষ্ঠান টাটা গোষ্ঠী। তারা একটি মানবিক ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। টাটা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমান দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। শুধু তাই নয়, আহতদের চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ঘোষণাটি দেওয়া হয় টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরণের পক্ষ থেকে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই ধরনের ঘটনা ভাষায় প্রকাশের ঊর্ধ্বে। যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। এন. চন্দ্রশেখরণ আরও জানান, টাটা গোষ্ঠী শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ নয়, বরং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এর অংশ হিসেবে বিজে মেডিকেল কলেজের যে ছাত্রাবাসটি দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে, সেটি নতুন করে নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।
টাটার এই ঘোষণা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত মানবিক ও সময়োপযোগী হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও অর্থ কোনোভাবেই হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের ফিরিয়ে আনতে পারে না, তবু এই আর্থিক সহায়তা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনরুদ্ধারে এবং নতুন করে জীবন গুছিয়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি সাহসিক ভরসা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এই দুর্ঘটনা কেবল একটি যান্ত্রিক বিপর্যয় নয়; বরং এটি দেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি ভয়াবহ বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুর্ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়ে। ঘটনাটি আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিলো যে, উন্নত প্রযুক্তি ও পরিচালনার পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই যাত্রীসুরক্ষার প্রধান শর্ত।
১২ জুন, ২০২৫—এই দিনটি ভারতের ইতিহাসে আরেকটি শোকাবহ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল, যা হাজারো মানুষের কান্না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং মানবিকতা ও সহানুভূতির নিদর্শন—সব কিছুরই এক অসামান্য সংমিশ্রণ হয়ে থাকবে।