প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের দায় নিয়ে উপাচার্য, দুই সহ-উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ভবন এলাকায় সৃষ্টি হয় টানটান পরিস্থিতি, যা পুরো ক্যাম্পাসে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক (ড. এ আর মল্লিক) ভবনের সামনে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এই ভবনেই উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার, সহ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, সহ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কার্যালয় অবস্থিত। কর্মসূচির শুরু থেকেই ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানান এবং দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
দুপুর গড়িয়ে বেলা একটার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ভবনের মূল ফটকের সামনে বসে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের হাতে বিভিন্ন ধরনের ব্যানার ও ফেস্টুন দেখা যায়, যেখানে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি বন্ধ, দলীয়করণ রোধ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় সহ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন সেখানে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নেতা-কর্মীরা স্লোগান দিতে শুরু করলে তিনি মূল ফটক এড়িয়ে ভবনের পাশের সিঁড়ি দিয়ে নিজের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া চবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে, তাতে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাব স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, সহ-উপাচার্যের মেয়ে, শিক্ষকের ভাই, শিক্ষকের শ্যালিকা কিংবা শিক্ষকের জামাতারা কীভাবে এবং কোন যোগ্যতায় নিয়োগ পেলেন, সে বিষয়ে প্রশাসনকে জবাব দিতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, এখানে নিয়োগ হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, আত্মীয়তা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
আবদুল্লাহ আল নোমান আরও বলেন, যেসব নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে এবং নতুন করে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে নিয়োগ দিতে হবে। তিনি দাবি করেন, নিয়োগে দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও সুনাম দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। তাঁর অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘরানাকে সুবিধা দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি থেকে আপত্তি জানানো হলেও তা উপেক্ষা করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
একই সুরে কথা বলেন শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জালাল সিদ্দিকী। তিনি বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। তিনি দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি সত্যিই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে বিশ্বাস করে, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ তদন্তের পথ সুগম করা উচিত।
এই আন্দোলন শুধু ছাত্ররাজনীতির একটি কর্মসূচি নয়, বরং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের একটি স্পর্শকাতর ইস্যুকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। অতীতেও বিভিন্ন সময় নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি নিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
অবস্থান কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে সহ-উপাচার্য (প্রশাসনিক) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ছাত্রদলের উত্থাপিত দাবির বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা না আসায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই আন্দোলন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের কারণে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই চান, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক সংকটই নয়, বরং নৈতিক সংকটেও পরিণত হয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ছাত্রদল নেতারা জানিয়েছেন, আজকের অবস্থান কর্মসূচির পরও তাঁদের দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তাঁদের মতে, এটি কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ও পদত্যাগ দাবিকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি আরও বিস্তৃত আন্দোলনে রূপ নেবে—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই সংকট কোন পথে এগোবে।