ইয়েমেনে ক্ষমতার বদল: নতুন প্রধানমন্ত্রী শায়া মোহসেন জিনদানি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৩ বার
ইয়েমেন নতুন প্রধানমন্ত্রী জিনদানি

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন। 

ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেশটির শাসনব্যবস্থায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। প্রধানমন্ত্রী সালেম বিন ব্রেইক পদত্যাগ করার পর তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন শায়া মোহসেন জিনদানি। তিনি এর আগে ইয়েমেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং কূটনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ হিসেবে বিবেচিত। এই পরিবর্তনকে ঘিরে ইয়েমেনের রাজনৈতিক মহলে যেমন আলোচনা শুরু হয়েছে, তেমনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন সালেম বিন ব্রেইক। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা গ্রহণ করা হয় এবং দ্রুত নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হয়। ইয়েমেনের সরকারি বার্তাসংস্থা সাবা জানিয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই দ্রুত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রশাসনিক শূন্যতা যেন সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল দ্রুত পদক্ষেপ নেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শায়া মোহসেন জিনদানির প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তরে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ, আর দক্ষিণে সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রশাসন। এই বাস্তবতায় নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি ভাঙা রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়া।

ইয়েমেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০১৪ সাল একটি মোড় ঘোরানো সময়। সে বছর ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর আল হাদী দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। রাষ্ট্রক্ষমতার এই নাটকীয় পরিবর্তনের পর থেকেই ইয়েমেন কার্যত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। হুথি বিদ্রোহীদের দমন এবং আল হাদীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরানোর লক্ষ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠিত হয়।

২০১৫ সাল থেকে এই জোট হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। প্রায় ১১ বছর ধরে চলমান এই সংঘর্ষে ইয়েমেন ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বা আহত হয়েছে, কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ইয়েমেনকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। খাদ্যাভাব, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে শায়া মোহসেন জিনদানির নেতৃত্বে নতুন সরকার কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় জিনদানি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ইয়েমেনের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নতুন দায়িত্বে কিছুটা সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা। প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের ভেতরেও নানা মতপার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থ এক নয়। একই সঙ্গে উত্তরের হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকার সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়। সামরিক সমাধানের বদলে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনের কথা বহুবার উঠে এলেও বাস্তবে তার অগ্রগতি সীমিত।

সাধারণ ইয়েমেনি নাগরিকদের কাছে সরকার পরিবর্তনের খবর নতুন আশার পাশাপাশি উদ্বেগও নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ চায় স্থিতিশীলতা ও শান্তি। তারা এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যারা অন্তত ন্যূনতম নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী সেই প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।

আঞ্চলিক রাজনীতির দিক থেকেও এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ইয়েমেন দীর্ঘদিন ধরেই এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নতুন সরকারের অবস্থান ও কৌশল এই আঞ্চলিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলও ইয়েমেন পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে, কারণ লোহিত সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা এই সংঘাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সব মিলিয়ে, শায়া মোহসেন জিনদানির প্রধানমন্ত্রিত্ব ইয়েমেনের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও তা সহজ হবে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং গভীর মানবিক সংকট—এই সবকিছু সামাল দিয়েই তাকে এগোতে হবে। ইয়েমেনের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন তাকিয়ে আছে, এই নেতৃত্ব পরিবর্তন আদৌ শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে কোনো বাস্তব অগ্রগতি আনতে পারে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত