প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রায় ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে উৎসাহ, আশা ও প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রচার-প্রচারণা। এই ধারাবাহিকতায় শাকসু নির্বাচন সামনে রেখে ২৮ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেল। প্যানেলটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বাস্তব চাহিদা, অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ১৫ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্যানেলের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) প্রার্থী দেলওয়ার হাসান শিশির এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা সরব হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পর শাকসু নির্বাচন ঘিরে এমন খোলামেলা রাজনৈতিক আলোচনা শিক্ষার্থীদের মাঝে ভিন্ন মাত্রার আবহ তৈরি করেছে।
ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, আবাসন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নসহ সামগ্রিক শিক্ষাজীবনকে কেন্দ্র করে নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়। প্যানেলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য নয়, বরং নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ পাওয়ার অধিকার রাখে। সেই লক্ষ্যেই ২৮ দফার প্রতিটি প্রস্তাবনা সাজানো হয়েছে।
ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হিসেবে উঠে এসেছে জুলাই কর্নার স্থাপন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি। প্যানেলটির মতে, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস ও শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগকে স্মরণে রাখতে ক্যাম্পাসে জুলাই কর্নার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদারে অতীতের সহিংস ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
একাডেমিক কার্যক্রমে ছাত্র সংসদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে শাকসুকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শাকসু কার্যত অচল থাকায় শিক্ষার্থীদের মতামত ও প্রতিনিধিত্ব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করাই তাদের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্যানেল নেতারা।
আবাসন সংকট শাবিপ্রবির একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ইশতেহারে শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যাতে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীরাও নিরাপদ ও সহনীয় পরিবেশে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খাবার ও পরিবহন ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে হলের খাবারের মান ও ক্যাম্পাস পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইশতেহারে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সংরক্ষণের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। শাবিপ্রবি একটি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষাঙ্গন। এখানে ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে অধ্যয়ন করে। সেই ঐক্য ও সহাবস্থান অটুট রাখার অঙ্গীকার প্যানেলটির রাজনৈতিক বার্তায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে শাবিপ্রবির সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে। গবেষণা কার্যক্রম সমৃদ্ধকরণ, দক্ষতা ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও সফট স্কিল বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষা মেন্টরিং, আন্তর্জাতিক সংযোগ জোরদার, টিউশন অ্যাপ চালু, বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং স্মার্ট সলিউশন ও প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবনের জন্য আরও প্রস্তুত হতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা এবং দুর্নীতিমুক্ত ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্যানেলটি শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ না থাকায় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি যোগাযোগ ও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে অনেকের অভিযোগ।
নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি ইশতেহারে আলাদাভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। নিরাপদ ক্যাম্পাস, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তায় সাইবার সেল গঠন, মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন, র্যাগিং ও হয়রানিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনি সেবা ও মানবাধিকার সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ ক্যাম্পাস গঠনের কথাও বলা হয়েছে, যা একটি আধুনিক ও মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশের প্রতিফলন বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
ইশতেহার ঘোষণাকালে ভিপি প্রার্থী দেলওয়ার হাসান শিশির বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর শাবিপ্রবিতে শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি বলেন, এই ২৮ বছরের সঙ্গে মিল রেখেই এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় ২৮ দফা ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও আবেগের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।
উল্লেখ্য, আগামী ২০ জানুয়ারি শাকসু নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুরো ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিভিন্ন প্যানেলের পোস্টার, স্লোগান ও প্রচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে শাবিপ্রবি। দীর্ঘদিন পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। এখন দেখার বিষয়, প্রতিশ্রুতির এই ইশতেহার বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার কাঁধে যায় এবং নতুন শাকসু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে।