মিরকাদিম আড়তে ইলিশের ঝিলিক, দাম চড়া ধাক্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
মিরকাদিম আড়তে ইলিশের ঝিলিক, দাম চড়া ধাক্কা

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাঘের কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করেই মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম মাছের আড়ত সকালে জমে ওঠে এক বিশেষ চিত্রে। ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী এই প্রাচীন হাটে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রেতারা সাজিয়ে নেন ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছের পসরা। বিশেষ করে রুপালি ইলিশের ঝিলিক আড়তের শীতল হাওয়ায় ভেসে আসে ক্রেতাদের মন মাতানোর মতো দৃশ্য। ছোট-বড় সব ধরনের ইলিশই বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে, যা ক্রেতাদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

মিরকাদিম আড়তের দোকানপাট সকাল থেকেই মানুষের পদচারণায় মুখরিত। ইলিশের স্বাদ নিতে ও পরিবারের জন্য সংগ্রহ করতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। এ সময় দেখা যায়, ছুটির দিনে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার থেকে তিন হাজার দুইশ টাকা পর্যন্ত, আর অর্ধেক কেজি থেকে সাতশ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম পৌঁছেছে দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুইশ টাকা পর্যন্ত। সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, এমন উচ্চমূল্য ভোক্তাদের জন্য এক ধরণের চাপ সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে যারা পরিবারে নিয়মিত ইলিশ ভোজনের অভ্যাস রাখেন।

ইলিশের পাশাপাশি হাটে পাওয়া যায় আইড়, পাঙাশ, বোয়াল, শিং, কৈ, রুই, কাতল, চিতলসহ নানা জাতের দেশি মাছ। হিমায়িত সামুদ্রিক মাছও এখানে পাওয়া যায়। নদী এবং চাষের মাছের দামের পার্থক্য ক্রেতাদের কাছে চোখে পড়ার মতো। নদীর পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি আটশ থেকে এক হাজার টাকায়, চাষের পাঙাশ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, চাষের রুই ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং নদীর কাতল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। এছাড়া দেশি বোয়াল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চাষের বোয়াল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং নদীর আইড় এক থেকে দেড় হাজার টাকায় বেচা হচ্ছে। ক্রেতারা বলছেন, সব ধরনের মাছের দামই বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে ইলিশের দাম সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে।

ক্রেতাদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সিন্ডিকেটের কারণে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিক্রেতারা দাবি করছেন, নদী দূষণ ও নাব্য সংকটের কারণে মিঠা পানির মাছ কমে গেছে। মুন্সীগঞ্জ মিরকাদিম মৎস্য আড়ত সমিতির সভাপতি আল হেলাল রয়েল বলেন, নদীনালাগুলোর যথাযথ পরিচর্যা হচ্ছে না। দখল, দূষণ ও কারেন্ট জালের ব্যবহার মাছের ক্ষতি করছে। এর ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাচ্ছে, যা বাজারে দামের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।

মিরকাদিম আড়তের প্রতিদিনের বেচাকেনা সংক্রান্ত তথ্যও চমকপ্রদ। ভোরের এই হাটে ৪৩টি আড়ত মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রায় এক কোটি টাকার মাছ বিক্রি করে থাকে। এ আয় কিন্তু সরাসরি হাটের অর্থনৈতিক গতিশীলতার পরিচায়ক। বিক্রেতারা মনে করেন, এ হাট শুধু স্থানীয় মানুষের জন্য নয়, আশেপাশের জেলার মানুষও এখানে মাছ কিনতে আসে, যার ফলে আড়তের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।

হাটে ভিড় করা ক্রেতারা বলছেন, শীতকালে ইলিশের উপস্থিতি তাদের কেবল ভোজনের স্বাদেই সন্তুষ্টি দিচ্ছে না, বরং পরিবারের সঙ্গে এই মাছ ভাগাভাগি করার আনন্দও বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ভোরের আড়তের খোলাখুলি পরিবেশ, মাছের ঝিলিক, বিক্রেতাদের হাঁকডাক—সব মিলিয়ে এটি একটি একান্ত শৈল্পিক ও সামাজিক দৃশ্য। তবুও ক্রেতারা অভিযোগ করেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় সীমিত পরিমাণ মাছ কেনার সুযোগ পান।

এছাড়া ক্রেতারা হাটের ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নদীর ইকোসিস্টেমের অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা মনে করেন, নদীতে অবৈধ জাল ও দূষণ প্রতিরোধ না হলে মিঠা পানির মাছের উৎপাদন কমতে থাকবে এবং বাজারে দাম আরও বেড়ে যাবে। বিক্রেতারা বলছেন, নদীর যথাযথ পরিচর্যা, কারেন্ট জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মৎস্য চাষের মান উন্নয়ন করলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই সুবিধাজনক হবে।

মিরকাদিম মাছের আড়ত শুধু মাছের জন্য নয়, এটি মুন্সীগঞ্জের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আড়তের ভোরের হাঁকডাক, মাছের ঝিলিক, ক্রেতাদের ক্রমাগত আগমন—সব মিলিয়ে একটি প্রাণবন্ত চিত্র তৈরি করে। মিরকাদিম আড়ত স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং বিশেষ করে শীতকালে মাছের চাহিদা এখানে তুঙ্গে থাকে।

উপসংহারে বলা যায়, মিরকাদিম আড়তে ইলিশের ঝিলিক এবং চড়া দাম একদিকে ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে আড়ত ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য তা একটি বিশেষ আকর্ষণ। নদীর পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো না হলে এই ধরনের চড়া দাম স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে। মিরকাদিম আড়তের মাছের বাজার শুধু মুন্সীগঞ্জ নয়, পুরো দেশবাসীর নজর কাড়ছে, যেখানে ইলিশের ঝিলিক ও দাম সব সময়ই আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত