প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার পর অবশেষে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে কিছুটা ভাটা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত এই মূল্যবান ধাতু সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসে খানিকটা চাপের মুখে পড়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কা কমে যাওয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া এবং প্রত্যাশার তুলনায় শক্তিশালী মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য বিনিয়োগকারীদের মনোভাব বদলে দিয়েছে। এর ফলে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দামে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্সে শূন্য দশমিক তিন শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬০৩ দশমিক ০২ ডলারে। মাত্র দুই দিন আগেই, বুধবার, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭২ ডলার ছুঁয়েছিল। সেই রেকর্ড গড়ার পরই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়ে দেয়।
যদিও স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম কমেছে, তবে একই সময়ে ডেলিভারির জন্য মার্কিন সোনার ফিউচার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। মার্কিন সোনার ফিউচার শূন্য দশমিক চার শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৬০৬ দশমিক ৭০ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বাজারে এই ধরনের ভিন্নমুখী প্রবণতা অস্বাভাবিক নয়। অনেক সময় ফিউচার বাজার বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায়, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের চাহিদা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
স্বর্ণের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান ধাতু রুপার বাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। শুক্রবার স্পট সিলভারের দাম প্রতি আউন্সে এক দশমিক এক শতাংশ কমে ৯১ দশমিক ৩৩ ডলারে নেমে আসে। অথচ আগের সেশনেই রুপার দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫৭ ডলার স্পর্শ করেছিল। শিল্পক্ষেত্র ও বিনিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই রুপার ব্যবহার থাকায় এই ধাতুর দাম স্বর্ণের তুলনায় অনেক সময় বেশি অস্থির থাকে। সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে সেই অস্থিরতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নেওয়ার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। সাধারণত যুদ্ধ, সংঘাত বা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে স্বর্ণ নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা কমে গেলে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহও কিছুটা হ্রাস পায়।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জুলিয়াস বেয়ারের বিশ্লেষক কার্স্টেন মেনকে মনে করেন, সম্প্রতি সোনার বাজারে যে দ্রুতগতির উত্থান দেখা গিয়েছিল, তা এখন কিছুটা থমকে গেছে। তাঁর ভাষায়, মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্যই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। শক্তিশালী মার্কিন শ্রমবাজার, ভোক্তা ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত ডলারের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে। আর ডলার শক্তিশালী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মুদ্রাধারী বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যা চাহিদাকে প্রভাবিত করে।
ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা হ্রাস পাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি ইরানের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটিতে যে বিক্ষোভ চলছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনাও আপাতত প্রশমিত হয়েছে। ফলে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হামলার আশঙ্কা এই মুহূর্তে নেই বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকিভীতি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, স্বর্ণের বাজার দীর্ঘমেয়াদে এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুত বাড়ানোর প্রবণতা এবং ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতির দিকনির্দেশনা স্বর্ণের দামের জন্য সহায়ক উপাদান হিসেবেই কাজ করছে। সাম্প্রতিক পতনকে অনেকেই তাই সাময়িক সংশোধন হিসেবে দেখছেন, বড় কোনো ধস হিসেবে নয়।
বিশ্ববাজারের এই ওঠানামার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও ধীরে ধীরে পড়তে পারে। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের পরিবর্তন স্থানীয় বাজারে প্রতিফলিত হতে কিছুটা সময় লাগে। তবে দীর্ঘদিন ধরে দাম বাড়তে থাকায় দেশের সাধারণ ক্রেতারা স্বর্ণ কেনা থেকে কিছুটা বিরত ছিলেন। দাম কমার এই খবর তাদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করতে পারে, যদিও সেটি নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে এই নিম্নমুখী ধারা কতটা স্থায়ী হয় তার ওপর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে সাম্প্রতিক পতন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। এটি যেমন স্বল্পমেয়াদি মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজার পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের গতিপথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।