আফ্রিকায় প্রভাব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন লড়াই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭০ বার
আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাব

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ওঠানামা করা সম্পর্কের পর আফ্রিকায় নিজের অর্থনৈতিক প্রভাব ও অবস্থান ধরে রাখতে ক্রমশ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে চীন ও রাশিয়ার দ্রুত বিস্তৃত বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উপস্থিতি, অন্যদিকে আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক সীমিত বাণিজ্য—এই দুই বাস্তবতা মিলিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য আফ্রিকা এখন আর শুধু সম্ভাবনার মহাদেশ নয়, বরং প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনো মূল মার্কিন বৈশ্বিক বাণিজ্যের খুবই সামান্য অংশ জুড়ে রয়েছে।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারাভিত্তিক হাচি বায়রাম ভেলি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইউনুস তুরহান আনাদোলুকে বলেন, মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। এই সময়ে কোনো স্থায়ী ঊর্ধ্বমুখী ধারা গড়ে ওঠেনি, বরং বৈশ্বিক সংকট, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৩৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্বৃত্তে ছিল। তবে এই ইতিবাচক চিত্র খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০১৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকায় রপ্তানি নেমে আসে ২৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে এবং আমদানি কমে দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্ববাজারে তেলের দামের পতন এবং আফ্রিকার অনেক দেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

করোনাভাইরাস মহামারী বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে ধাক্কা দেয়, তার প্রভাব আফ্রিকা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ২০২০ সালে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নেমে আসে ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে এবং আমদানি কমে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে। মহামারীর কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জ্বালানি চাহিদার পতন এই মন্দার প্রধান কারণ ছিল।

তবে ২০২১ সাল থেকে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যায়। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে এবং আমদানি লাফিয়ে বেড়ে ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। ২০২২ সালে আমদানি আরও বেড়ে সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ওঠে, যা মূলত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ আমদানির কারণে সম্ভব হয়। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৩ সালে রপ্তানি কমে ২৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে এবং আমদানি দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪ সালে আবার রপ্তানি বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও আমদানি ছিল ৩৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকায় রপ্তানি প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে।

ইউনুস তুরহান বলেন, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার মধ্যে বার্ষিক গড় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই অঙ্কটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় খুবই নগণ্য। তার ভাষায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৭ দশমিক ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে আফ্রিকার অংশ মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় আফ্রিকার গুরুত্ব বাড়লেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আফ্রিকা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি প্রান্তিক অংশীদার হিসেবেই রয়ে গেছে।

তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০০০ সালে চালু হওয়া আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপরচুনিটি অ্যাক্ট বা এজিওএ আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে ৩২টি আফ্রিকান দেশ ১ হাজার ৮০০টিরও বেশি পণ্য শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। ২০০২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই কর্মসূচির আওতায় আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ এজিওএ আরও তিন বছরের জন্য বাড়ানোর একটি বিল পাস করেছে, যা আফ্রিকার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার একটি রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ইউনুস তুরহান মনে করেন, শুধু শুল্ক সুবিধা দিয়ে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। তার মতে, আফ্রিকান নেতারা এবং ট্রাম্প প্রশাসন উভয়ই এখন বিদেশি সাহায্যনির্ভর সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগভিত্তিক একটি নতুন মডেলের দিকে এগোতে আগ্রহী। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্য এখনো মূলত তেল ও কাঁচামালনির্ভর, যা দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বড় বাধা।

তিনি আরও বলেন, এজিওএ কার্যকর হওয়ার পর আফ্রিকা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য প্রায় ৮৬ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্য বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ। এই তুলনাই দেখায়, আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির গতি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অংশীদারদের তুলনায় অনেক ধীর।

এই প্রেক্ষাপটে আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন ও রাশিয়া। চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আফ্রিকার সঙ্গে চীনের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ পৌঁছেছে ৩১৪ বিলিয়ন ডলারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে রাশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই রাশিয়ার রপ্তানি। যদিও অঙ্কের দিক থেকে রাশিয়া অনেক পিছিয়ে, তবু নিরাপত্তা সহযোগিতা ও রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে দেশটি আফ্রিকায় নিজের অবস্থান জোরদার করছে।

ইউনুস তুরহান বলেন, চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে আফ্রিকান ইস্যুতে প্রায়ই একসঙ্গে ভোট দেয় এবং আফ্রিকায় তাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পৃক্ততা ক্রমেই বাড়ছে। এই বাস্তবতা ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগজনক, কারণ আফ্রিকার রাজনৈতিক সমর্থন বৈশ্বিক কূটনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই প্রতিযোগিতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও উন্নয়ন লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। ইউনুস তুরহানের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তুরস্কের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা, যারা আফ্রিকায় বাণিজ্য, অবকাঠামো ও মানবিক সহায়তায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তার মতে, একক আধিপত্য নয়, বরং অংশীদারিত্বভিত্তিক কৌশলই আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরে রাখার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত