চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে অপেক্ষা আরও দুই বছর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে অপেক্ষা আরও দুই বছর

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসনে নগরবাসীকে আরও দেড় থেকে দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। বহু প্রতীক্ষিত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খালের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থাকায় প্রকল্পের সার্বিক সমাপ্তি সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা অপসারণ ও অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘদিন আটকে থাকা কাজগুলো এখন পুরোদমে শুরু হয়েছে, তবে প্রকৃতিগত সীমাবদ্ধতা ও বর্ষা মৌসুমের কারণে একটানা কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালের আগস্টে। প্রায় সাড়ে আট বছর ধরে চলমান প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি বর্তমানে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্পের আওতায় থাকা ২১টি খালের কাজ ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে এবং বাকি খালগুলোর কাজও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে।

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, হিজড়া খাল, মিরজা খাল ও জামালখান খাল—এই তিনটি খালের কাজ শেষ হতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগছে। আগে এসব খালের কিছু অংশে কাজ সম্পন্ন হলেও অধিকাংশ জায়গায় খাল প্রশস্তকরণ ও প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ বন্ধ ছিল। শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ায় বর্তমানে এসব খালে আবারও পুরোদমে কাজ চলছে। তবে এপ্রিলের দিকে বর্ষা মৌসুম শুরু হলে আবার কাজ বন্ধ রাখতে হবে, ফলে প্রকল্পের চূড়ান্ত সমাপ্তি সময় আরও পিছিয়ে যাবে।

চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতার চিত্র আগের তুলনায় ইতিমধ্যে অনেকটাই উন্নত হয়েছে। একসময় নগরের অন্তত ১১৩টি এলাকায় টানা ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমে থাকত। ধীরে ধীরে প্রকল্পের কাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ও পানি জমে থাকার সময় কমে আসে। গত বছর মাত্র ২৯টি স্থানে পানি জমেছিল এবং সেসব এলাকায় সর্বোচ্চ দুই থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই পানি নেমে গেছে। চলতি বছরে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে ১০টি স্থানে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, পানি জমলেও তা এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই নেমে যাবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরবর্তীতে কাজের পরিধি বাড়ায় সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। বর্ধিত ব্যয়ের অংশ হিসেবে ৭৫৩ কোটি টাকা ঋণ এবং আরও ৭৫৩ কোটি টাকা নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের শর্ত দিয়েছিল সিডিএকে। তবে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় সিডিএ এই অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার আবেদন জানালেও তৎকালীন সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। ফলে বিশেষ করে হিজড়া খালের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এই সংকট নিরসনে ৬৫০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে দিতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে ঋণ হিসেবে নিতে হচ্ছে মাত্র ১০৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি সিডিএকে নিজস্ব তহবিল থেকে ৭৫৩ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এই অর্থায়ন জটিলতা কাটায় প্রকল্পের বাকি কাজ আবার গতি পেয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি খালের মুখে জোয়ার প্রতিরোধক ফটক বা টাইডাল রেগুলেটর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি বালুর ফাঁদ বা সিল্ট ট্র্যাপ নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে খালে পলি জমে নাব্যতা কমে না যায়। সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে ১০৮টি এবং ৫৬৪ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ, মেরামত ও পরিষ্কার করা হয়েছে।

বর্তমানে যে তিনটি খালের কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে হিজড়া খাল অন্যতম। এই খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং এটি এম এম আলী সড়ক, প্রবর্তক মোড়, পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা হয়ে চকবাজার অতিক্রম করে চাক্তাই খালে গিয়ে মিলেছে। এই এলাকাগুলো চট্টগ্রামের সবচেয়ে জলাবদ্ধতাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। হিজড়া খালের প্রশস্ততা আগে যেখানে ১০ থেকে ১৫ ফুট ছিল, সেখানে এখন তা গড়ে ২০ থেকে ৩২ ফুট পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। এই খালের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৬৩১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, স্থাপনার ক্ষতিপূরণ, প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ, খননকাজ এবং সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দীর্ঘদিন বরাদ্দ জটিলতায় পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জ এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ কার্যক্রম থমকে ছিল। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এই সমস্যার সমাধান হওয়ায় এখন পুরোদমে কাজ চলছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রবর্তক মোড় ও কাতালগঞ্জ এলাকায় খালের দুই পাশে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কারণে সাময়িকভাবে পানি জমে জনদুর্ভোগ তৈরি হলেও কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য এই ভোগান্তি অনিবার্য।

মিরজা খালও নগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল ২ নম্বর গেট এলাকা থেকে শুরু হয়ে শীতল ঝরনায় গিয়ে মিশেছে। খালটির প্রশস্ততা আগে ছিল ১৫ থেকে ৪৫ ফুট, যা এখন বাড়িয়ে ৩১ থেকে ৫৬ ফুট করা হচ্ছে। সম্প্রতি নাসিরবাদ আবাসিক এলাকায় খালের জায়গা দখল করে নির্মিত একটি ১২ তলা ভবনের অংশবিশেষ অপসারণ করা হয়েছে। একই এলাকায় খাল প্রশস্তকরণ ও শুলকবহরে সিডিএ অ্যাভিনিউয়ের ওপর সেতু নির্মাণকাজও চলমান রয়েছে।

জামালখান খালের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগে যেখানে খালটির প্রশস্ততা ছিল ৯ থেকে ২০ ফুট, সেখানে এখন তা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ১৬ থেকে সর্বোচ্চ ২৮ ফুট করা হচ্ছে। জামালখান ও লাভলেইন এলাকায় খালের প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আহম্মদ মঈনুদ্দিন জানান, বর্তমানে চলমান তিনটি খালের কাজ শেষ করতে সাত থেকে আট মাস সময় লাগবে। তবে বর্ষা মৌসুমের কারণে এপ্রিলের পর কাজ বন্ধ রাখতে হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আগামী বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তিনি আরও বলেন, কাজ চলাকালে জনদুর্ভোগ যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প শুধু একটি উন্নয়ন উদ্যোগ নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় প্রত্যাশা। প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে যাওয়া রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্মৃতি নগরবাসী এখনো ভুলতে পারেনি। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করবে—এমন আশাই এখন সবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত