পোশাকশিল্পে ৯% মজুরি বৃদ্ধি: পাচ্ছেন কেউ, বঞ্চিত অনেকেই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৮ বার
পোশাকশিল্পে ৯% মজুরি বৃদ্ধি: পাচ্ছেন কেউ, বঞ্চিত অনেকেই

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত ৯ শতাংশ বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির বাস্তব চিত্রে স্পষ্ট বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। সরকার ও মালিক-শ্রমিক সমঝোতার ভিত্তিতে নিয়মিত ৫ শতাংশের সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে সব কারখানায় তা কার্যকর হয়নি। বড় ও কমপ্লায়েন্ট কারখানার শ্রমিকেরা এই বাড়তি মজুরি পেলেও ছোট, মাঝারি এবং সাবকন্ট্রাকটিং কারখানার বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনো বঞ্চিত রয়েছেন। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে নাজুক জীবনযাপন করা শ্রমিকদের মধ্যে আবারও অসন্তোষ দানা বাঁধছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। গাজীপুর, সাভারের আশুলিয়া ও আশপাশের এলাকায় তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে রাজপথে নামেন। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকনেতাদের মধ্যে ১৮ দফা সমঝোতা হয়। ওই সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল, বিদ্যমান নিয়মিত ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত ৪ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি দেওয়া, যাতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারেন শ্রমিকেরা।

সমঝোতা অনুযায়ী শ্রম মন্ত্রণালয় ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়ন ও বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির সক্ষমতা নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করে। পাঁচ দফা বৈঠকের পর কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এই অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকবে। সেই অনুযায়ী প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়। গত বছর বড় পোশাক কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে শ্রমিকদের ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি দেয়। কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। অনেক কারখানাই নানা অজুহাতে এই বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দেয়নি।

চলতি বছরেও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকনেতারা বলছেন, উন্নত কর্মপরিবেশ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে। এসব কারখানার বেশির ভাগই ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক উৎপাদন করে। বিদেশি ক্রেতাদের কঠোর নিরীক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চাপ থাকায় তারা শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি নিতে চায় না। কিন্তু ছোট, মাঝারি ও সাবকন্ট্রাকটিং কারখানাগুলোতে সেই চাপ না থাকায় শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

শ্রমিকনেতা বাবুল আখতার মনে করেন, এটি সরাসরি শ্রম আইনের লঙ্ঘন। তাঁর ভাষায়, বড় কারখানাগুলো গতবার যেমন অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েছিল, এবারও দিচ্ছে। অথচ ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো দিচ্ছে না, যা স্পষ্ট বৈষম্য। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেসব কারখানামালিক শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।

অন্যদিকে মালিকপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, চলতি বছর অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ এখন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের খরচ দ্বিগুণ হয়েছে, উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এই অবস্থায় অনেক মাঝারি কারখানার পক্ষে বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যাঁদের সক্ষমতা আছে, তাঁরা দিচ্ছেন; যাঁদের নেই, তাঁরা দিতে পারছেন না।

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানও একই ধরনের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, চলতি বছর বিদ্যমান ৫ শতাংশের সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সরকার থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা বৈঠক না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর কঠোর অডিটের কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ কমপ্লায়েন্ট কারখানা এই বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে বলে তিনি জানান।

শ্রমিকদের জন্য এই ৯ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং তাদের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শ্রমিকনেতারা বলছেন, অতিরিক্ত ৪ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হলে শ্রমিকদের মূল মজুরি ও বাড়িভাড়ার অংশ কিছুটা বেশি হারে বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে ওভারটাইমের মজুরি, উৎসব ভাতা এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধার ওপরও। অর্থাৎ এই ইনক্রিমেন্ট না পাওয়া মানে শুধু মাসিক বেতন কম পাওয়া নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত হওয়া।

দেশে বর্তমানে কতটি কারখানা এই বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিজিএমইএ কিংবা বিকেএমইএ—কোনো সংস্থার কাছেই হালনাগাদ তথ্য নেই। তবে শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত বছর আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেটের ২ হাজার ৯৩২টি কারখানার মধ্যে ৭৩ শতাংশ শ্রমিকদের ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েছিল। আশুলিয়ায় এই হার ছিল ৯১ শতাংশ, গাজীপুরে ৬১ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫৪ শতাংশ। নারায়ণগঞ্জে শতভাগ কারখানা এই ইনক্রিমেন্ট দিয়েছিল। যদিও চলতি বছরের চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ নেই। তাঁর মতে, নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে। চলতি সপ্তাহ শেষে বোঝা যাবে, কত কারখানা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। আইন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কথা এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরিকাঠামো কার্যকর করতে হবে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ মজুরিকাঠামো কার্যকর হওয়ার পর ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রম আইন সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যেখানে পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্মূল্যায়নের বিধান রাখা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে শ্রমিকদের প্রত্যাশা বেড়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা সেই প্রত্যাশাকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

সব মিলিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পে ৯ শতাংশ বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি এখনো কাগজে-কলমে সমানভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। একদিকে যারা পাচ্ছেন, তারা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন; অন্যদিকে যারা পাচ্ছেন না, তারা মূল্যস্ফীতির চাপে আরও পিছিয়ে পড়ছেন। শ্রমিক-মালিক ও সরকারের সমন্বিত ও স্পষ্ট উদ্যোগ ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত