শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় হোয়াটসঅ্যাপে আসছে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬ বার
শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় হোয়াটসঅ্যাপে আসছে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, বিনোদন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুতেই অনলাইনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তবে এর পাশাপাশি বাড়ছে অনলাইন ঝুঁকি, বিশেষ করে অপরিচিত ব্যক্তি, প্রতারক ও অনুপযুক্ত কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা। এই বাস্তবতায় শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা জোরদার করতে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন ফিচার ও আপডেট নিয়ে তথ্য প্রকাশকারী ওয়েবসাইট ডব্লিউএবেটাইনফোর তথ্যমতে, নতুন এই প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা বর্তমানে উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ হিসেবে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের সঙ্গে অপরিচিত ব্যক্তি ও অনলাইন প্রতারকদের যোগাযোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই সুবিধাটি মূলত ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। নতুন ব্যবস্থায় একটি প্রাথমিক অ্যাকাউন্ট এবং একটি সেকেন্ডারি অ্যাকাউন্ট যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। প্রাথমিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারী হিসেবে অভিভাবকেরা সন্তানের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবেন। এর মাধ্যমে তাঁরা সন্তানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের কিছু নির্দিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে সার্বিক ধারণা পাবেন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সন্তানের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় অভিভাবকেরা কোনোভাবেই ব্যক্তিগত বার্তার বিষয়বস্তু দেখতে পারবেন না।

ডব্লিউএবেটাইনফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিভাবকেরা কেবল চ্যাটের কার্যক্রমসংক্রান্ত সারসংক্ষেপ ও অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সাধারণ তথ্য দেখতে পারবেন। যেমন—কার সঙ্গে কত ঘন ঘন যোগাযোগ হচ্ছে, নতুন কোনো অচেনা নম্বর যুক্ত হয়েছে কি না, কিংবা অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা সেটিংসে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না। এর ফলে সন্তানের ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে, যা অভিভাবকদের জন্য একটি বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করবে।

নতুন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধার অন্যতম লক্ষ্য হলো অজানা বা সন্দেহজনক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি কমানো। নিরাপত্তার স্বার্থে শিশুদের অ্যাকাউন্ট থেকে শুধু সংরক্ষিত নম্বরের ব্যক্তিদেরই বার্তা পাঠানো ও কল করার সুযোগ রাখা হতে পারে। একইভাবে, কেবল পরিচিত ব্যক্তিরাই শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এতে করে অপরিচিত ব্যক্তি বা সম্ভাব্য প্রতারকদের হঠাৎ করে যোগাযোগ করার সুযোগ অনেকাংশে সীমিত হবে।

এ ছাড়া সন্তানের প্রোফাইল ছবি, সর্বশেষ অনলাইন অবস্থার তথ্য এবং ‘অ্যাবাউট’ অংশ কারা দেখতে পারবেন, সে বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ থাকবে অভিভাবকদের হাতে। অভিভাবকেরা চাইলে এই তথ্যগুলো শুধুমাত্র পরিচিত বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য দৃশ্যমান করতে পারবেন। এর ফলে শিশু-কিশোরদের ব্যক্তিগত তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমান সময়ে অনলাইনে ক্ষতিকর লিংক, ফিশিং বার্তা ও প্রতারণামূলক কথোপকথনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা না বুঝেই এসব লিংকে ক্লিক করে কিংবা অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনে জড়িয়ে পড়ে বিপদে পড়ছে। নতুন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ লিংকে প্রবেশ বা অনিরাপদ কথোপকথনের আশঙ্কা আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এতে অভিভাবকেরা প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিতে পারবেন।

তবে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে হোয়াটসঅ্যাপ বরাবরই ‘এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন’ প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। হোয়াটসঅ্যাপে আদান-প্রদান করা প্রতিটি বার্তা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে, যার ফলে বার্তার বিষয়বস্তু প্রেরক ও প্রাপক ছাড়া অন্য কেউ—এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ নিজেও—দেখতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নতুন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা চালু হলেও এই এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন অক্ষুণ্ন থাকবে। অর্থাৎ শিশুদের ব্যক্তিগত বার্তার গোপনীয়তা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগ। একদিকে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হোয়াটসঅ্যাপের প্রস্তাবিত ফিচারটি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিভাবকেরা দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। অনেক অভিভাবক সন্তানের ফোন ব্যবহারের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন, আবার কেউ কেউ প্রযুক্তিগত সমাধানের অপেক্ষায় ছিলেন। হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন উদ্যোগ সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সচেতন করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোন ধরনের কথোপকথন বা লিংক ঝুঁকিপূর্ণ, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা অভিভাবকদের সেই আলোচনার একটি সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

সব মিলিয়ে, শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হোয়াটসঅ্যাপের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সুবিধা একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি চালু হলে অভিভাবকেরা যেমন সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম নিয়ে আরও সচেতন থাকতে পারবেন, তেমনি শিশুদের জন্যও একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত