প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সূচনা হয়েছে ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় একযোগে এই ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি দেশের পাঁচটি বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে একসঙ্গে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল থেকেই পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যেও দেখা গেছে উদ্বেগ আর প্রত্যাশার মিশ্র অনুভূতি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কলা, আইন, সামাজিক বিজ্ঞান ও চারুকলা অনুষদ এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট নিয়ে গঠিত ‘এ’ ইউনিটে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৭টি। এসব আসনের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৫১৫টি। সেই হিসাবে প্রতি আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গড়ে ৬১ জন শিক্ষার্থী। বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণের ফলে এই ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও বাড়তি গুরুত্ব ও প্রস্তুতি নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এবারের ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা দুই শিফটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম শিফট সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় শিফট বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত চলবে। এক ঘণ্টাব্যাপী এমসিকিউ পদ্ধতির এই পরীক্ষা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে একযোগে গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা ভর্তিচ্ছু ও অভিভাবকদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির কারণ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, প্রাথমিক এমসিকিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পরবর্তী লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসেই অনুষ্ঠিত হবে। এতে করে চূড়ান্ত ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের একবার হলেও ক্যাম্পাসে উপস্থিত হতে হবে। সংশ্লিষ্ট অনুষদভেদে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষার সময়সূচি পরে জানানো হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
‘এ’ ইউনিটের আসন বিন্যাস অনুযায়ী, কলা অনুষদে রয়েছে সর্বাধিক ৯৩১টি আসন। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ৬৩৬টি, আইন অনুষদে ১৬০টি, চারুকলা অনুষদে ১২০টি এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ৫০টি আসন রয়েছে। প্রতিটি অনুষদে আসনসংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিযোগিতাও বেশ তীব্র। বিশেষ করে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বরাবরের মতো এবারও বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সকাল থেকেই ছিল কর্মচাঞ্চল্য। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ের আগেই কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছেন। অভিভাবকরাও সন্তানের সঙ্গে এসে ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। পরীক্ষার পরিবেশ নির্বিঘ্ন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকেই নানা প্রস্তুতি নিয়েছে।
ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সুবিধার্থে ক্যাম্পাসে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি হেল্পডেস্ক। এসব হেল্পডেস্ক থেকে পরীক্ষাকেন্দ্র খুঁজে পাওয়া, সময়সূচি জানা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া অভিভাবকদের জন্য ১১টি পৃথক টেন্ট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তাঁরা অপেক্ষা করতে পারছেন। সুপেয় পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে একাধিক স্থানে, যাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কোনো অসুবিধায় না পড়েন।
যানজট কমাতে এবং পরীক্ষার্থীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে সকাল সাড়ে ৯টার পর থেকে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এতে করে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও আশপাশের এলাকায় তুলনামূলকভাবে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও চোখে পড়েছে।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনসিসি, রোভার স্কাউট এবং ফিজিক্যালি ডিজঅ্যাবল্ড ফোরামের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে জালিয়াতি ও প্রক্সি পরীক্ষার মতো অনিয়ম প্রতিরোধে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতও সক্রিয় রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রস্তুতির পর এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে তাঁরা যেমন নার্ভাস, তেমনি আশাবাদীও। রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা বলেন, দেশের অন্যতম বড় ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন থেকেই তাঁদের এই কঠিন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। অভিভাবকরাও আশা প্রকাশ করেছেন, তাঁদের সন্তানরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না। পরীক্ষা শেষে উত্তরপত্র মূল্যায়ন দ্রুত সম্পন্ন করে ফল প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এবারের ভর্তি মৌসুমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। বিপুল প্রতিযোগিতা, কঠোর নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এই পরীক্ষা শেষ হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।