প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে গতি আনল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলায় ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছে। শনিবার সকালে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় রওনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই পর্যবেক্ষকদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার লক্ষ্যে এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
শনিবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের উপপ্রধান পর্যবেক্ষক ইন্তা লাসে এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকেরা ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের একটি কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য অংশ। মাঠপর্যায়ে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করেই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলনের আগে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন্তা লাসে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পরিবেশ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রচার কার্যক্রম বোঝার জন্য সময় নিয়ে মাঠে থাকার বিকল্প নেই। এই কারণেই ইইউ ইওএম দীর্ঘমেয়াদি ও দেশব্যাপী পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
ইন্তা লাসে আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী পদ্ধতি অনুসরণ করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সব পর্যায়কে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে কোনো একটি দিক আলাদাভাবে প্রাধান্য না পায় এবং সামগ্রিক চিত্রটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তিনি বলেন, নির্বাচন মানে কেবল ভোটগ্রহণের দিন নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়াই পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকেরা নিজ নিজ দায়িত্বপূর্ণ অঞ্চলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচার কার্যক্রম, প্রশাসনের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটারদের অংশগ্রহণের পরিবেশ। একই সঙ্গে তারা ঢাকাভিত্তিক মূল বিশেষজ্ঞ দলের বিশ্লেষণমূলক কাজেও সহায়তা করবেন। এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পর্যায় ও মাঠপর্যায়ের তথ্য একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রস্তুত করা হবে।
ইন্তা লাসে জানান, পর্যবেক্ষকেরা দুই সদস্যের দল গঠন করে কাজ করবেন। তারা স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলবেন, নির্বাচন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। পাশাপাশি নাগরিক পর্যবেক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং তরুণ কর্মীদের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ রাখবেন। এই কার্যক্রম শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক থাকবে না, বরং ছোট শহর এবং গ্রাম পর্যায়েও বিস্তৃত থাকবে, যাতে দেশের সার্বিক নির্বাচনী বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।
ইইউ কর্মকর্তারা জানান, এই পর্যবেক্ষক দল শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো থেকেই নয়, বরং কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ড থেকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বহুজাতিক এই অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ মিশনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর আগে সব পর্যবেক্ষককে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া, বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনগত কাঠামো, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন মোতায়েন করা হয়েছে। মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইইয়াবস। তিনি গত ১১ জানুয়ারি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মিশনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। ওই সময় তিনি বলেন, ইইউ বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করাই এই মিশনের মূল লক্ষ্য।
নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, পর্যবেক্ষণ মিশনের কার্যক্রম ততই জোরদার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তখন আরও ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক মাঠে নামবেন। এই স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকেরা মূলত ভোটগ্রহণের দিন, ভোট গণনা এবং ফল সংকলন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হবেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরাও।
এ ছাড়া ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের একটি প্রতিনিধিদলও এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনে অংশ নেবে। সব মিলিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনে প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক কাজ করবেন। এই বৃহৎ উপস্থিতি বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আগ্রহ এবং গুরুত্বের প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করবে। এই প্রতিবেদনে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রাথমিক মূল্যায়ন তুলে ধরা হবে। এরপর পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হলে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
ইইউ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উভয় প্রতিবেদনই মিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যাতে দেশি ও আন্তর্জাতিক সব পক্ষ সহজেই সেগুলো পর্যালোচনা করতে পারে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই প্রকাশনা নীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন কঠোর আচরণবিধি অনুসরণ করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করাই তাদের মূল নীতি। তারা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে অবস্থান নেয় না এবং নির্বাচনী ফলাফলের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে না। বরং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং সেগুলোর ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করাই তাদের একমাত্র কাজ।
২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গৃহীত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালা ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ইইউ ইওএম তাদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই নীতিমালার আওতায় স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই বাংলাদেশে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন তাদের দায়িত্ব পালন করছে।