প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকায় যানজট ও বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে গত দুই দিনে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৫০০টি মামলা করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। একই সময়ে অবৈধ পার্কিং ও সড়ক দখলের অভিযোগে শত শত যানবাহনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা এবং চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা যানবাহন ডাম্পিং ও রেকারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগ জানায়, রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল এলাকায় ট্রাফিক-মতিঝিল বিভাগ ৪৮০টি মামলা করেছে। এই বিভাগের অভিযানে ৩১টি বাস, ২টি ট্রাক, ২৪টি কাভার্ড ভ্যান, ৮৯টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ২৮৫টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মতিঝিল এলাকায় অবৈধ পার্কিং, লাইসেন্স ও কাগজপত্রের ত্রুটি এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার অভিযোগই ছিল মামলার প্রধান কারণ।
পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার ওয়ারী এলাকায় ট্রাফিক-ওয়ারী বিভাগ সবচেয়ে বেশি মামলা করেছে। এই বিভাগে মোট ১ হাজার ৩৯৭টি মামলা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১২৯টি বাস, ১৫৫টি ট্রাক, ১৪৫টি কাভার্ড ভ্যান, ১৭৪টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ৫৫৮টি মোটরসাইকেল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওয়ারী এলাকায় সংকীর্ণ সড়ক হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত যান চলাচল এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছিল। সেই প্রেক্ষিতেই সেখানে অভিযান জোরদার করা হয়।
শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত তেজগাঁও এলাকায় ট্রাফিক-তেজগাঁও বিভাগ ২৮৯টি মামলা করেছে। এই অভিযানে ৯টি বাস, ৬টি ট্রাক, ১৪টি কাভার্ড ভ্যান, ৩৩টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ১৫৬টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, তেজগাঁও এলাকায় ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং সময়সীমা না মেনে ট্রাক চলাচলের অভিযোগে এসব মামলা দেওয়া হয়েছে।
উত্তর ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা মিরপুরে ট্রাফিক-মিরপুর বিভাগ ১ হাজার ৩০৫টি মামলা করেছে। এই বিভাগে অভিযানের সময় ১৩৯টি বাস, ৩৩টি ট্রাক, ৫৮টি কাভার্ড ভ্যান, ১২২টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ৭৬২টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। মিরপুর এলাকায় ফুটপাত দখল, উল্টো পথে চলাচল এবং হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর মতো অপরাধ বেশি ধরা পড়ে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
কূটনৈতিক এলাকা ও অভিজাত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত গুলশানে ট্রাফিক-গুলশান বিভাগ ২৩৩টি মামলা করেছে। এই অভিযানে ১৩টি বাস, ৭টি ট্রাক, ১২টি কাভার্ড ভ্যান, ১৩টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ১০৫টি মোটরসাইকেল আইনের আওতায় এসেছে। গুলশানে মূলত অবৈধ পার্কিং, নির্ধারিত স্থানের বাইরে যাত্রী ওঠানামা এবং সিগন্যাল অমান্য করার অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়েছে।
উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে ট্রাফিক-উত্তরা বিভাগ ৩৫১টি মামলা করেছে। এখানে ৩০টি বাস, ৮টি ট্রাক, ১৫টি কাভার্ড ভ্যান, ৫৫টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ১৫৯টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিমানবন্দর সড়ক ও আশপাশের এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রমনা এলাকায় ট্রাফিক-রমনা বিভাগ ১৯৮টি মামলা করেছে। এই বিভাগে ১০টি বাস, ৩টি কাভার্ড ভ্যান, ২০টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ১০১টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। একই সময়ে পুরান ঢাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লালবাগে ট্রাফিক-লালবাগ বিভাগ ২৪৭টি মামলা করেছে। সেখানে ১৩টি বাস, ১২টি ট্রাক, ২টি কাভার্ড ভ্যান, ১৯টি সিএনজি অটোরিকশা এবং ১৯৯টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, এই দুই দিনের অভিযানে শুধু মামলা নয়, বড় পরিসরে যানবাহন অপসারণের কাজও করা হয়েছে। অভিযানের সময় মোট ৬৬৫টি যানবাহন ডাম্পিং করা হয়েছে এবং ২১৩টি যানবাহন রেকারের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব যানবাহন মূলত অবৈধভাবে সড়কে দাঁড়িয়ে থেকে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছিল।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নিয়মিত অভিযান অত্যন্ত জরুরি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালক ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও এই কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য। তারা জানান, অনেক চালক এখনো ট্রাফিক আইন সম্পর্কে উদাসীন। নিয়ম না মানার প্রবণতা কমাতে শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলমান থাকবে।
এ বিষয়ে ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন লাখো মানুষ যাতায়াত করে। ট্রাফিক আইন না মানলে শুধু একজন চালক নয়, পুরো নগরবাসী ভোগান্তির শিকার হয়। তাই শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক বিভাগ কোনো ছাড় দেবে না। তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নগরবাসীর একটি বড় অংশ এই অভিযানের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং যানজটের তীব্রতা কমবে। তবে কিছু চালক অভিযোগ করছেন, কখনো কখনো তাৎক্ষণিক জরিমানার কারণে তারা আর্থিক চাপে পড়ছেন। এ বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগ বলছে, আইন মানলে কোনো ধরনের জরিমানার মুখে পড়তে হবে না।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এই ধরনের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চালক, যাত্রী ও পথচারী সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন মেনে চলাই পারে রাজধানীর যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে, এমন প্রত্যাশাই করছেন নগরবাসী।