প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক পরিচালকের বক্তব্য ঘিরে কয়েক দিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে দেশের ক্রিকেট অঙ্গন। ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রকাশ্যে বাজে ও অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে বিসিবির পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার কোনো জবাব আসেনি। পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম এখনও নীরব রয়েছেন, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে তার দায়বদ্ধতা ও বোর্ডের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে।
বিসিবি সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হয়ে গেলেও বোর্ডে কোনো লিখিত ব্যাখ্যা জমা পড়েনি। ফলে আদৌ তিনি এই নোটিশের উত্তর দেবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিসিবির ভেতরেও আলোচনা চলছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এই বিতর্কের সূত্রপাত গত বুধবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। একটি অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার বক্তব্যকে অনেকেই অবমাননাকর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন হিসেবে আখ্যা দেন। বিশেষ করে একজন বিসিবি পরিচালক হয়ে প্রকাশ্যে ক্রিকেটারদের মানহানিকর ভাষায় আক্রমণ করাকে কেউই ভালোভাবে নেয়নি।
এটি প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে কটূক্তি করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এম নাজমুল ইসলাম। তখনও তার বক্তব্য ঘিরে ক্রিকেটপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তবে সেবার বিষয়টি বড় কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ পর্যন্ত গড়ায়নি। এবার ধারাবাহিক অভিযোগ ও প্রকাশ্য মন্তব্যের কারণে বিসিবি বাধ্য হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।
বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, নোটিশে পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বক্তব্য কেন শৃঙ্খলা পরিপন্থী নয়, সে বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন মন্তব্য থেকে বিরত থাকার নিশ্চয়তাও প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি পদে থেকে এ ধরনের মন্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্নও নতুন করে উঠেছে। দেশের ক্রিকেটাররা যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তখন বোর্ড পরিচালকদের বক্তব্য তাদের মানসিক অবস্থা ও দলের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানে এবং বোর্ড ও দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক ক্রিকেটভক্ত বিসিবির কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একজন পরিচালক যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন এবং তার পরেও জবাবদিহির আওতায় না আসেন, তাহলে সেটি বোর্ডের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও ন্যায্য সিদ্ধান্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
বিসিবির ভেতরে অবশ্য এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি। বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নোটিশের জবাব না এলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা আইন ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজনে শৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতে পারে। তবে এসব সিদ্ধান্ত সময়সাপেক্ষ এবং বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে এম নাজমুল ইসলামের নীরবতা নিয়েও নানা জল্পনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ বলছেন, হয়তো শেষ মুহূর্তে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেবেন। তবে সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনাও ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বর্তমানে একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে। দল পুনর্গঠন, তরুণ ক্রিকেটারদের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স উন্নত করার চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বোর্ড পরিচালকদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে বোর্ডের উচিত দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এবং প্রমাণ করা যে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্নে কোনো আপস হবে না।
সব মিলিয়ে, বিসিবির কারণ দর্শানোর নোটিশের পরও এম নাজমুল ইসলামের নীরবতা শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং তা পুরো ক্রিকেট প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, বোর্ড এই পরিস্থিতি কীভাবে সামলায় এবং এর মাধ্যমে দেশের ক্রিকেটে কী বার্তা দেওয়া হয়।