প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত গাজা ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কার্যক্রম তদারকির লক্ষ্যে গঠিত এ পর্ষদে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্প। আঙ্কারা ও কায়রো—উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরিচিত এই দুই নেতার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ গাজা ইস্যুকে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই শান্তি পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। এই পর্ষদের অধীনে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট বডি বা অন্তর্বর্তী প্রশাসন গাজায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে। শান্তি পর্ষদ তাদের ওপর তদারকি করবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে—এমনটাই পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে গাজা সংকট নিয়ে নিজের শান্তি পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনেন। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এই পরিকল্পনায় সম্মতি জানায় বলে দাবি করে ওয়াশিংটন। যদিও বাস্তব পরিস্থিতিতে হামলা ও পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় এই সম্মতির কার্যকারিতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। তবু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ এগিয়ে নিতে শান্তি পর্ষদকে একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে হোয়াইট হাউস।
গত শুক্রবার শান্তি পর্ষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। তালিকায় রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক হোয়াইট হাউস উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার, মার্কিন ধনকুবের মার্ক রোয়ান, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, ট্রাম্পের উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল এবং জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক বিশেষ দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ। হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, এই পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এমন প্রেক্ষাপটে তুরস্ক ও মিসরের রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর খবর সামনে আসে। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্র শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, এরদোয়ান এক দিন আগে ট্রাম্পের কাছ থেকে শান্তি পর্ষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। অন্যদিকে একই দিনে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি কায়রোয় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট আল-সিসি ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যে আমন্ত্রণ পেয়েছেন, তা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে।
মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিতে তুরস্ক ও মিসরের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তুরস্ক তুলনামূলকভাবে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে আসছে এবং প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান একাধিকবার ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে মিসর গাজার সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় যুদ্ধবিরতি, ত্রাণ প্রবেশ এবং কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান শান্তি পর্ষদে যুক্ত হলে উদ্যোগটি কেবল পশ্চিমা নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এমন আশা প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি শান্তি উদ্যোগের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়েছেন। অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানের কারণে গাজায় চরম খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। পুরো গাজার জনগোষ্ঠী কার্যত অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। জাতিসংঘের তদন্ত কমিটিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইসরায়েল অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষ জিম্মি হওয়ার ঘটনার পর আত্মরক্ষার্থেই তারা সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, হামাসকে দুর্বল করা এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে এই যুক্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সর্বজনস্বীকৃত হয়নি।
শান্তি পর্ষদের অধীনে গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রথম কাজ হিসেবে গাজাবাসীর জন্য জরুরি ত্রাণ, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করাও পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
গাজার অনেক বাসিন্দা ও ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মাটিতে যুদ্ধ চলতে থাকলে কাগুজে শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তাঁদের মতে, শান্তি পর্ষদ তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন তা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ এবং মানবিক করিডোর নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। অন্যথায় এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আরেকটি প্রতীকী উদ্যোগে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে গাজায় শান্তি পর্ষদ গঠনের ঘোষণা যেমন আশার আলো জাগিয়েছে, তেমনি বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এরদোয়ান ও সিসির মতো প্রভাবশালী আঞ্চলিক নেতারা যদি সত্যিই এতে যুক্ত হন, তবে পর্ষদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ওজন বাড়তে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত গাজার মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হবে যুদ্ধ থামানো, ত্রাণ পৌঁছানো এবং ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধানের বাস্তব অগ্রগতির ওপরই।