কান্না ও আশার মিলনমেলা: গুম–খুনের পরিবারে তারেক রহমান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
কান্না ও আশার মিলনমেলা: গুম–খুনের পরিবারে তারেক রহমান

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র শনিবার পরিণত হয়েছিল এক বেদনাঘন মানবিক প্রাঙ্গণে। সেখানে কেউ এসেছেন গুম হওয়া বাবার স্মৃতি বুকে নিয়ে, কেউ সন্তান হারানোর অসহ্য যন্ত্রণায়, কেউবা স্বামীর শূন্যতা নিয়ে। চোখে জল, কণ্ঠে ক্ষোভ আর হৃদয়ে প্রশ্ন—এই বাংলাদেশে কেন এমনটি ঘটল? ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ আয়োজনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এমনই দৃশ্যের জন্ম হয়। আর সেই আবেগের স্রোতে নিজেকেও সামলাতে পারেননি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সন্তানহারা এক মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন তিনি, মুছেছেন অশ্রুসিক্ত চোখ।

অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিকতার কৃত্রিমতা। ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা। কোনো মা বারবার প্রশ্ন করছিলেন, “আমার খোকা কোথায়?” কোনো স্ত্রী বলছিলেন, কীভাবে একা একা সন্তানদের মানুষ করছেন। কোনো ছেলে বাবার মুখের কথা মনে করে নির্বাক হয়ে পড়ছিলেন। ১৭ বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের শিকার হয়ে অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জন—বাবা, সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী। তাদের কণ্ঠে একটাই দাবি, এই অন্যায়গুলোর সুষ্ঠু বিচার।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, “বহু সন্তান আজও অপেক্ষায়—গুম হয়ে যাওয়া বাবা একদিন ফিরে দরজায় কড়া নাড়বেন। অনেক মা এখনও আশায়, হারিয়ে যাওয়া সন্তানটি আবার ‘মা’ বলে ডাকবে। এই অপেক্ষা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় দায়।” তাঁর এই কথায় পুরো মিলনায়তন নিস্তব্ধ হয়ে আসে। শোকের ভারে নত হয়ে আসে উপস্থিত সবার চোখ।

দেড় যুগের বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটানো তারেক রহমান বলেন, গুম–খুনের বিভীষিকার দিন শেষ হয়েছে এবং দেশ ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে থাকার অঙ্গীকার করে বলেন, রাষ্ট্র কখনোই তাদের ভুলে যেতে পারে না। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে এসব শহীদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে বিস্তারিত বলা সম্ভব না হলেও তিনি জানান, শহীদদের নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নামকরণ করা হবে, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের গৌরবের সঙ্গে স্মরণ করে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে গুমের শিকার পারভেজ হোসেনের মেয়ে আদিবা ইসলাম হৃদি আবেগভরে প্রশ্ন তোলেন, “গুম কমিশন বলে, ধরে নিন ওরা গুম… ওরা মৃত। কেন আমরা ধরে নেব? এটা কি কোনো অঙ্ক?” তিনি বলেন, রাজনীতি করা কোনো অপরাধ নয়। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারেক রহমানের কাছে বাবাকে খুঁজে দেওয়ার আকুতি জানান। তাঁর কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার ক্ষোভ—বছর আসে, বছর যায়; কিন্তু বাবা আর ফেরে না।

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর গুম হওয়া সোহেল হোসেনের মেয়ে শাফা হোসেন বলেন, এক যুগের বেশি সময় বাবার অপেক্ষায় কাটছে তাদের জীবন। বাবার মুখটা আর একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা আজও বুকের ভেতর কাঁপে। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া কায়সার হোসেনের মেয়ে লামিয়া আক্তার মিম বলেন, “আমি জানিই না বাবা জিনিসটা কী। যদি জানতাম, আর কোনোদিন বাবাকে পাব না, তাহলে সেদিন শক্ত করে জড়িয়ে ধরতাম।”

২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর কুমিল্লার লাকসাম থেকে গুম হওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম হিরু ও পৌর বিএনপির সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির পারভেজের ছেলে রাতুল বলেন, তাঁর বাবা ও বাবার চাচাকে একসঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজও তাদের কোনো সন্ধান নেই। তাঁর প্রশ্ন, “আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?”

তারেক রহমান বলেন, বিএনপির কর্মীরা কখনো কৌশলের নামে গুপ্ত বা সুপ্তবেশ ধারণ করেনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার কারণেই দলটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, যে দলের নেতাকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, সেই দলকে দমিয়ে রাখা যায় না। নির্যাতিত পরিবারগুলোর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ যেন বৃথা না যায়, সে জন্য সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনটি গুম–খুন–অপহরণের শিকার পরিবারগুলোর হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। একইভাবে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ দলীয় সক্ষমতার সবটুকু দিয়ে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ভাষায়, বছরের পর বছর দমন–পীড়নের পরও বিএনপির একজন নেতাকর্মী রাজপথ ছাড়েনি। একই পরিবারের এক ভাই গুম হওয়ার পর আরেক ভাই পরদিন রাজপথে নেমে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছে—এটাই বিএনপির শক্তি।

তারেক রহমান সতর্ক করে বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ হাতছাড়া করা হলে শহীদদের আত্মত্যাগের অবমূল্যায়ন হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গত ১৬ বছরে গুম–খুনের শিকার মানুষ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন—সবাই একই ধারার সংগ্রামের অংশ। এসব অন্যায়ের বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাংলাদেশে অবশ্যই একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন।

নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিএনপি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে ধৈর্যের পরিচয় দিতে চায়। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন গুম থেকে ফিরে আসা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, রুহুল কবির রিজভী, রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং গুম হওয়া এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা। তাঁদের কথায় উঠে আসে ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতি, দীর্ঘ লড়াই আর ন্যায়বিচারের আকুতি।

দিনের শেষে মিলনায়তন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও অনেক মায়ের চোখে জল শুকায়নি। তবু তাদের চোখে ছিল একফোঁটা আশা—হয়তো একদিন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে, এই কান্নার ন্যায্য বিচার হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত