শৈলকুপায় চরমপন্থী আতঙ্কে স্তব্ধ গ্রামবাংলা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
শৈলকুপায় চরমপন্থী আতঙ্কে স্তব্ধ গ্রামবাংলা

প্রকাশ: ১৮  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় আবারও ফিরে এসেছে চরমপন্থী আতঙ্কের ছায়া। একসময় যে জনপদ চরমপন্থী দমনের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়েছিল, সেই এলাকাতেই এখন সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে অদৃশ্য ভয়ের অন্ধকার। গ্রামে গ্রামে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট হয়ে উঠছে জনশূন্য, আর সাধারণ মানুষ রাতের বেলা বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি যেন নতুন করে তাড়া করছে শৈলকুপার মানুষকে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার দুধসর, নিত্যানন্দপুর, আবাইপুর, যুগনীসহ অন্তত ২০টির বেশি গ্রামে সম্প্রতি অজ্ঞাত পরিচয়ের সশস্ত্র ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়েছে। তারা কখনো নিজেদের নিষিদ্ধ কোনো চরমপন্থী সংগঠনের সদস্য পরিচয় দিচ্ছে, আবার কখনো ভিন্ন নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবি করছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি। কোথাও কোথাও মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গ্রামের মানুষ বলছেন, সন্ধ্যার পর থেকেই আতঙ্ক আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কয়েকজন মুখোশধারী মোটরসাইকেল আরোহী দল বেঁধে গ্রামে ঢোকে। তারা বাড়ি বাড়ি খোঁজ নেয়, কারা সামর্থ্যবান, কার কাছ থেকে কত টাকা আদায় করা যাবে—সেই তালিকা তৈরি করে। কোনো কোনো বাড়ির দরজায় কাগজ রেখে যাওয়া হয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে বলা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা না দিলে ‘পরিণতি ভয়াবহ হবে’—এমন ভাষাও ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়েছে। সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখার সাহস করছেন না ব্যবসায়ীরা। বাজারে ক্রেতা নেই, কেনাবেচা প্রায় অচল। কৃষকরা বলছেন, মাঠে কাজ শেষে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। কেউ কেউ নিরাপত্তার অভাবে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। বিশেষ করে যাদের নাম চাঁদার তালিকায় এসেছে, তারা রাত জেগে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই নয়, সামাজিক জীবনেও পড়েছে মারাত্মক প্রভাব। রাতে বিয়ে, মিলাদ, ওয়াজ মাহফিল বা অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। কেউ কেউ সন্তানদের সন্ধ্যার পর কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। নারীদের মধ্যেও ভয়ের মাত্রা বেশি; রাতের বেলা প্রয়োজন হলেও ঘর থেকে বের হতে পারছেন না অনেকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শৈলকুপা এলাকায় লাল পতাকা বাহিনী, পুরোনো সর্বহারা গ্রুপ এবং জনযুদ্ধ নামের কয়েকটি নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠনের তৎপরতা নতুন করে চোখে পড়ছে। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর এসব গোষ্ঠী আবারও তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেছে বলে অভিযোগ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব চরমপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রভাবশালী মহল এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগাযোগের খবর।

স্থানীয়ভাবে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, নির্বাচনী এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু রাজনৈতিক নেতা চরমপন্থীদের সহযোগিতা নিচ্ছেন। বিনিময়ে এসব গোষ্ঠী পাচ্ছে অর্থ, অস্ত্র ও নিরাপত্তার আশ্বাস। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং নব্বইয়ের দশকের মতো গ্রামে গ্রামে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। সংগঠন পরিচালনার নামে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও কৃষকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

যুগনী গ্রামের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রাত হলেই গ্রামে অচেনা মোটরসাইকেল ঘোরাফেরা করে। কে কোথায় থাকে, কার সামর্থ্য কত—সব তারা জানে। আগের মতো ভয়ভীতি আবার শুরু হয়েছে। শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেই হবে না, নিয়মিত টহল আর নজরদারি না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

মানবাধিকারকর্মী ও জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ মনে করেন, এই পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তাও অনেকাংশে দায়ী। তিনি বলেন, “শৈলকুপায় চরমপন্থীদের উপস্থিতি নতুন নয়। অনেক আগেই লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আবার প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আসন্ন নির্বাচনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পুরো নির্বাচনী পরিবেশই ঝুঁকির মুখে পড়বে।”

স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে চাপা উদ্বেগ রয়েছে। প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে না চাইলেও অনেকেই মনে করছেন, চরমপন্থীদের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থের মেলবন্ধন এলাকাকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এতে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।

অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎপর। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, চরমপন্থী তৎপরতা রোধে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল ও অভিযান চলছে। তিনি আশ্বাস দেন, “আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যারা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করি শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

তবে স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, শুধু আশ্বাসে আতঙ্ক দূর হবে না। তাদের দাবি, স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত পুলিশি উপস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। চরমপন্থীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস বা নীরব সমর্থন থাকলে তা বন্ধ করতে হবে।

শৈলকুপার গ্রামবাংলা এখন এক কঠিন সময় পার করছে। মানুষ শান্তিতে রাত কাটাতে চায়, নিরাপদে চলাফেরা করতে চায়, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সমাজের সব স্তরের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই আতঙ্কের চক্র ভাঙা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত