প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক অনিবার্য, বিতর্কিত কিন্তু একই সঙ্গে গভীরভাবে প্রভাবশালী চরিত্র। তাঁর জন্ম ও শাহাদতবার্ষিকী এলেই তাঁকে ঘিরে আলোচনা নতুন করে সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা লেখা, মন্তব্য ও বিশ্লেষণের সূত্র ধরে আবারও প্রশ্ন ওঠে—জিয়াউর রহমানকে কেন পাঠ করতে হবে, কেন তাঁর জীবন ও রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন প্রজন্মের সামনে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ব্যক্তিপূজার বাইরে গিয়ে ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা অনুধাবন করা প্রয়োজন।
বিশ্ব ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে একজন সেনানায়ক কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনাতেও গভীর ছাপ রেখেছেন। ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল কিংবা ভারতের মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর—এই নামগুলো প্রমাণ করে, সামরিক অভিজ্ঞতা কখনো কখনো রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার পথে অন্তরায় নয়, বরং সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে তা শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা হিসেবে ধরা দেয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্বের লড়াই। সেই সংকটময় সময়ে একজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। চট্টগ্রামে ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা এবং পরবর্তী সময়ে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা—এই দুটি ঘটনা জিয়াউর রহমানকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ সফল না হলে তাঁর পরিণতি হতো নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড। জেনেশুনেই তিনি সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্ত শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের মোড় ঘোরায়নি, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের গতিপথও প্রভাবিত করেছে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে, সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। একদলীয় শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভক্তি রাষ্ট্রকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। তাঁর শাসনামলকে কেউ সমর্থন করেছেন, কেউ সমালোচনা করেছেন; তবে এটাও সত্য যে, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেন, যা পরবর্তী রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ ছিল তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিক। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ ধারণা সামনে আনেন, যার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, খাদ্য ঘাটতি কমানো এবং গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিকে সচল করার চেষ্টা করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, এই বাস্তববাদী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিয়ে আসে।
সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে আসে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে একটি সুস্থ বেসামরিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে বিভক্ত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সেনাবাহিনী বড় বাধা। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত অবদান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা। ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে তিনি রাষ্ট্রিক সীমানা, ইতিহাস ও ধর্মীয় বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি ভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের কথা বলেন। সমর্থকদের মতে, এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি বাস্তববাদী প্রয়াস; সমালোচকদের মতে, এটি ছিল রাজনৈতিক কৌশল। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ধারণা পরবর্তী কয়েক দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং জাতীয় পরিচয় সংক্রান্ত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।
বিএনপি প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনি রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ। বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একত্র করার প্রয়াসে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন এবং পরে তা রাজনৈতিক দলে রূপ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতার কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় রাজনীতির নতুন অধ্যায় সূচনা করে।
তাঁর শাসনামল নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। সামরিক শাসনের বৈধতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ—এসব বিতর্ক ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ইতিহাস পাঠের উদ্দেশ্য যদি হয় কেবল প্রশংসা বা নিন্দা নয়, বরং উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ, তাহলে জিয়াউর রহমানকে পাঠ করা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাঁকে বোঝা মানে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, রাজনৈতিক সংকট ও উত্তরণের পথগুলো বোঝা।
জিয়াউর রহমানকে পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা তাই ব্যক্তি-জিয়া নয়, রাষ্ট্র-জিয়ার কারণে। তাঁর সিদ্ধান্ত, দর্শন ও সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়েই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের জন্য এই অধ্যায় জানা জরুরি, যাতে তারা বুঝতে পারে রাষ্ট্র গঠনের পথে কোন সিদ্ধান্তগুলো স্থিতিশীলতা এনেছে, কোনগুলো বিতর্ক তৈরি করেছে এবং কেন আজও তাঁর নাম ঘিরে আবেগ ও মতভেদ সমানভাবে সক্রিয়।
ইতিহাস কখনো একরৈখিক নয়। সেখানে আলো ও ছায়া পাশাপাশি থাকে। জিয়াউর রহমানকে পাঠ করা মানে সেই আলো-ছায়ার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করা। নিরপেক্ষ পাঠই পারে তাঁকে ব্যক্তি-উপাসনার ঊর্ধ্বে তুলে ইতিহাসের বাস্তব কাঠামোয় স্থাপন করতে।