শাকসু নির্বাচনে সিদ্ধান্তের ভার ৩৬ শতাংশ নারী ভোটারের হাতে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
শাকসু নির্বাচন

প্রকাশ: ১৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা শাকসু নির্বাচন ঘিরে ফিরেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যানার, পোস্টার, স্লোগান আর প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে মুখর বিশ্ববিদ্যালয়। এই নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত সমীকরণ হয়ে উঠেছে নারী ভোটারদের শক্ত অবস্থান। মোট ভোটারের ৩৬ শতাংশই নারী হওয়ায় শাকসুর নেতৃত্ব নির্ধারণে তাদের ভোট যে বড় ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।

শাকসু নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৯ হাজার ৪৭ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৩ হাজার ২১০ জন। শতাংশের হিসাবে যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৬ ভাগ। ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব নির্বাচনে এত বড় সংখ্যক নারী ভোটারের প্রভাব যে ফলাফলে দৃশ্যমান হবে, তা মেনে নিচ্ছেন প্রার্থী ও বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন কাছাকাছি, তখন এই নারী ভোটারদের সিদ্ধান্ত যেকোনো প্যানেলের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারে।

গত ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শাকসু নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়। তবে শীতকালীন ছুটি শেষে ৪ জানুয়ারি থেকে প্রচারণা পায় নতুন গতি। ক্যাম্পাসের টং দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, শিক্ষা ভবন, শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক হল এবং আশপাশের মেস ও বাসাবাড়িতে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। প্রচারপত্র হাতে নিয়ে প্রার্থীরা ভোট ও দোয়া চেয়েছেন শিক্ষার্থীদের দ্বারে দ্বারে। নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময় শেষে রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত প্রচারের সময় বাড়িয়ে দেওয়ায় শেষ মুহূর্তে প্রচারণা আরও জমে ওঠে।

আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন পরিস্থিতিও নারী ভোটারদের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। শাবিপ্রবিতে বর্তমানে তিনটি ছাত্রী হল রয়েছে, যেখানে আসনসংখ্যা ১ হাজার ৫৬৫টি। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে দুটি সাব-হলে প্রায় ২৭৫ জন ছাত্রী থাকেন। তবে মোট নারী শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্রী হলের বাইরে অবস্থান করেন। ফলে প্রায় অর্ধেক নারী ভোটারকে ভোট দিতে আসতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের আবাসন থেকে। এই বাস্তবতা নিরাপত্তা, পরিবহন ও আবাসনসংকটের প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে শাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, পোশাক ও চলাফেরার স্বাধীনতা, আইনি সহায়তার ব্যবস্থা, হেল্প ডেস্ক চালু, স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন—এসব বিষয় প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

এবারের নির্বাচনে তিনটি প্যানেল অংশ নিচ্ছে। ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’, ছাত্রদল-সমর্থিত ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে গঠিত ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল। নারী ভোটারদের গুরুত্ব বুঝে ছাত্রশিবির ও স্বতন্ত্র প্যানেল তাদের ইশতেহারে নারীবিষয়ক আলাদা দফা যুক্ত করেছে। তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ইশতেহার ঘোষণা না হলেও তাদের প্রার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে নিয়মিত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থা রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেল ছাত্রীদের জন্য কমনরুম উন্নয়ন ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের কথা বলছে। প্রতিটি প্যানেলই নারী শিক্ষার্থীদের ভোটকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরছে।

তবে ছাত্রীদের প্রত্যাশা কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগই তাদের কাছে মুখ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিরাপত্তা ও আবাসনসংকটই তাদের প্রধান উদ্বেগ। স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা ইসলাম হুমায়রা জানান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি হোস্টেলে থাকেন। নিয়মিত যাতায়াতে পরিবহনসংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তার জন্য বড় সমস্যা। তিনি বলেন, প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবায়ন হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জেরিন তাসনিম বলেন, ক্যাম্পাসে বিশেষ করে ছাত্রী হলের আশপাশে ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। চলাফেরায় নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন, যার মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশই নারী। বর্তমানে ২৮টি বিভাগে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ২১০। এই সংখ্যাই প্রমাণ করে, নারী ভোটাররা চাইলে ফলাফলের সমীকরণ বদলে দিতে পারেন। তাই তারা অধিকার নিয়ে সচেতন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হতে চান।

পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী মহসিনা আক্তার বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনই শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। তিনি মনে করেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিনিধিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাই ভোট নিয়ে তার আগ্রহ প্রবল।

তবে নারী ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব কম। এবারের শাকসু নির্বাচনে মোট প্রার্থী ৯৭ জন হলেও নারী প্রার্থী মাত্র সাতজন। শীর্ষ কোনো পদেই নারী প্রার্থী নেই। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা নানা কারণ তুলে ধরছেন। তাদের মতে, ট্যাগিং, বুলিং, রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা এবং সংগঠনিক সহায়তার অভাব নারীদের প্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত করে।

প্যানেলভিত্তিক পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট। ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলে একজন নারী প্রার্থী রয়েছেন। ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলে রয়েছেন তিনজন। স্বতন্ত্র ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেলে আছেন দুইজন নারী প্রার্থী। এর বাইরে প্যানেলের বাইরে থেকে ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক পদে একজন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাছমিমা মাহফুজ বলেন, ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে ট্যাগিং ও বুলিং বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবু নারী ভোটারদের সমর্থনের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

সব মিলিয়ে শাকসু নির্বাচন শুধু একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন নয়, বরং নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ৩৬ শতাংশ নারী ভোটার এই নির্বাচনে যে ব্যবধান গড়ে দেবেন, তা স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, সেই ভোট কতটা সচেতনভাবে প্রয়োগ হয় এবং নির্বাচিত নেতৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত