প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কলম্বিয়ার দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় যুক্ত হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘন জঙ্গলঘেরা এলাকায়। প্রভাব বিস্তার, মাদকপথের নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকটকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি গেরিলা গোষ্ঠীর ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিহতদের সবাই কলম্বিয়ার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী বা ফার্কের একটি বিভক্ত অংশের সদস্য। সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে এটি কলম্বিয়ায় গেরিলা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এই সংঘর্ষের স্থান গুয়াভিয়ারে বিভাগের এল রেতোরনো পৌরসভার একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা। রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই এটি কোকেন উৎপাদন, মাদক পাচার এবং অবৈধ খননের জন্য পরিচিত। দুর্গম বনাঞ্চল, দুর্বল রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি এবং সীমিত অবকাঠামোর সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ফলে এলাকাটি কার্যত একাধিক গেরিলা ও অপরাধী চক্রের প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে।
সামরিক সূত্র জানায়, সংঘর্ষে জড়ায় ফার্কের দুটি বিভক্ত গোষ্ঠী, যারা আগে একই জোটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একটির নেতৃত্বে রয়েছেন নেস্তর গ্রেগোরিও ভেরা, যিনি ‘ইভান মর্দিস্কো’ নামে পরিচিত। অন্য গোষ্ঠীর নেতা আলেকজান্ডার দিয়াস মেনদোজা, যার পরিচিত নাম ‘কালারকা কর্দোবা’। নিহত ২৭ জনই ভেরার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সদস্য বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। মেনদোজার গোষ্ঠীর এক জ্যেষ্ঠ নেতা স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেছেন, যদিও বিস্তারিত বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে।
এই দুটি গোষ্ঠী আগে ‘সেন্ট্রাল জেনারেল স্টাফ’ নামে পরিচিত একটি বৃহৎ ফার্ক বিভাজিত জোটের অংশ ছিল। তবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ এবং মাদকপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তারা আলাদা হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, বিভক্তির পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেটি সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের সময় টানা কয়েক ঘণ্টা গুলির শব্দ শোনা যায় এবং অনেক পরিবার নিরাপত্তার ভয়ে ঘর ছেড়ে আশপাশের এলাকায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে আলেকজান্ডার দিয়াস মেনদোজার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পেত্রো তার ‘সম্পূর্ণ শান্তি’ নীতির আওতায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেন, যার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটানো। তবে নেস্তর গ্রেগোরিও ভেরার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী সরকারের সঙ্গে ঘোষিত দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি স্থগিত হওয়ার পরও সহিংস তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সরকারের শান্তি প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দুটি গোষ্ঠীই ২০১৬ সালের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওই চুক্তির আওতায় প্রায় ১৩ হাজার ফার্ক সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন। তবে একটি অংশ চুক্তিকে নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী মনে করে অস্ত্র হাতে থেকেই যায়। সেই থেকেই কলম্বিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ডিসিডেন্ট’ বা বিচ্ছিন্ন ফার্ক গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ধরনের অভ্যন্তরীণ গেরিলা সংঘর্ষের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। গুয়াভিয়ারে ও আশপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সংঘর্ষের কারণে ফসল নষ্ট হচ্ছে, স্কুল বন্ধ থাকছে এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি করছে।
কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সংঘর্ষের পর এলাকায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক উপস্থিতি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ এই সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে মাদক ব্যবসা, অবৈধ খনন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সংকট। যতদিন এসব অবৈধ অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙা না যাবে, ততদিন সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা কলম্বিয়ার সশস্ত্র সংঘাতে এখন পর্যন্ত আনুমানিক চার লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দেশটির ইতিহাসে এটি অন্যতম দীর্ঘ ও জটিল সংঘাত হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শান্তি চুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে সহিংসতা কিছুটা কমলেও, এই ধরনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রমাণ করছে যে শান্তির পথ এখনো সহজ নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর শান্তি উদ্যোগ এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। একদিকে তিনি আলোচনার টেবিলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আনতে চাইছেন, অন্যদিকে গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সহিংস প্রতিযোগিতা সেই উদ্যোগকে বারবার ব্যাহত করছে। গুয়াভিয়ারের এই সংঘর্ষ তাই শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং কলম্বিয়ার সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
এই রক্তাক্ত সংঘর্ষ আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন। নতুবা জঙ্গলঘেরা এই অঞ্চলগুলোতে সহিংসতার আগুন বারবার জ্বলে উঠবে, যার মূল্য দিতে হবে নিরীহ মানুষের জীবন দিয়ে।