ইলন মাস্কসহ ১২ ধনকুবেরের সম্পদ ছাপিয়ে ৪০০ কোটি মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৯ বার
ইলন মাস্কসহ ১২ ধনকুবেরের সম্পদ ছাপিয়ে ৪০০ কোটি মানুষ

প্রকাশ: ১৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বৈষম্যের চিত্র আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১২ জন ধনকুবেরের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ এখন পৃথিবীর অতিদরিদ্র অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৪০০ কোটি মানুষের হাতে যত সম্পদ রয়েছে, তার চেয়েও বেশি সম্পদ কেবল হাতে গোনা কয়েকজন ধনকুবেরের নিয়ন্ত্রণে। এই তালিকায় রয়েছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কসহ বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা।

সোমবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনের আগে প্রতিবছরের মতো এবারও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অক্সফাম। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারদের সম্মিলিত সম্পদ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, এই সম্পদের পাহাড় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্যও ‘চরম বিপজ্জনক’ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

অক্সফামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে ধনকুবেরদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই বিপুল সম্পদের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত হয়েছে অল্প কয়েকজনের হাতে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ ১২ জন ধনকুবেরের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র অর্ধেক মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি।

প্রতিবেদনে এই প্রবণতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক নীতিকে বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর ধনকুবেরদের সম্পদ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেছে অক্সফাম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মধ্যেই অতিধনীদের সম্পদ ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির গতি ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

অক্সফামের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ শিথিল করার নীতি এবং করপোরেট কর কাঠামোয় পরিবর্তন ধনকুবেরদের জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ ন্যূনতম বৈশ্বিক করহার কার্যকর করার আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, এই ধরনের নীতি ধনীদের আরও ধনী হওয়ার পথ সুগম করছে, অথচ সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায্য করব্যবস্থা ও সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অক্সফামের নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ বেহার এ প্রসঙ্গে বলেন, ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। তাঁর ভাষায়, অঢেল অর্থ এখন রাজনৈতিক ক্ষমতা কেনার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হচ্ছে এবং নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর ক্রমেই চাপা পড়ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, তথ্য ও মতামত গঠনের ক্ষেত্রেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছেন। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিকানার উদাহরণ তুলে ধরে অক্সফাম দেখিয়েছে, কীভাবে এই ক্ষমতা ধনকুবেরদের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) কেনা এবং অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মালিকানা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অক্সফামের মতে, এই প্রবণতা গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। কারণ, তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা সহজ হয়। এতে করে সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চাবিকাঠি চলে যাচ্ছে অল্প কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে।

এদিকে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে উত্তেজনাও বাড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমনকে কেন্দ্র করে গত রোববার সেখানে প্রায় ৩০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান। বিক্ষোভকারীদের অনেকের মুখে ছিল ইলন মাস্ক ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মুখোশ। তারা বৈষম্য, কর ফাঁকি এবং ধনীদের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

সুইজারল্যান্ডের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির যুব শাখা ইয়াং সোশ্যালিস্টসের নেত্রী নাথালি রুয়াস বিক্ষোভে বলেন, গণতান্ত্রিক বৈধতা ছাড়াই দাভোসে বসে গুটিকয়েক মানুষ পুরো বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, এই ধরনের বৈশ্বিক সম্মেলনে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত থাকে, অথচ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের ওপর।

অক্সফামের প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধি এবং বৈষম্যের এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধনীদের প্রভাব আরও বাড়লে নীতিনির্ধারণ সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, কিছু অর্থনীতিবিদ যুক্তি দিচ্ছেন, ধনীদের বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। তবে অক্সফামের মতে, সমস্যা ধনীদের সম্পদ থাকা নয়, বরং সেই সম্পদের অতি কেন্দ্রীকরণ এবং তার রাজনৈতিক ব্যবহারে। সংস্থাটি বলছে, ন্যায্য করব্যবস্থা, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ছাড়া এই বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে অক্সফামের এই প্রতিবেদন বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে বিপুল সম্পদের কেন্দ্রীকরণ কি মানবিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক, নাকি এটি ভবিষ্যতের বড় সংকেত—সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দাভোস থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকদের আলোচনায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত