প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন অ্যাপ এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কাজের প্রয়োজনে হোক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগে—অ্যাপ ছাড়া এক মুহূর্তও যেন কল্পনা করা যায় না। তবে প্রযুক্তির এই সুবিধার আড়ালেই ক্রমে বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি। নতুন করে আবারও অ্যাপ ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছরে সাইবার অপরাধের ধরন ও মাত্রা আরও জটিল ও ভয়াবহ হতে পারে।
সম্প্রতি বিভিন্ন প্রযুক্তি ফোরাম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর টুল ও নতুন ফিচার যুক্ত হওয়ার ফলে অ্যাপের নিরাপত্তা কাঠামো আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে ‘গ্রোক টুলস’ সংক্রান্ত বিতর্কের পর থেকেই ডেটা সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অ্যাপ নির্মাতারাই এখন স্বীকার করছেন, আগের তুলনায় ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে এবং ব্যবহারকারীদের আগাম সতর্ক না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। সেখানে বলা হয়েছে, অনলাইন সহিংসতার শিকারদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই নারী। শুধু তাই নয়, চলতি বছরে এই হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে সাইবার অপরাধের বিভিন্ন ধরন প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিহিংসাবশত ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, অননুমোদিতভাবে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ব্ল্যাকমেইলিং এবং পরিচয় চুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা চ্যাটিং অ্যাপে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও বিনিময়ের প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকাকালীন শেয়ার করা ব্যক্তিগত কনটেন্ট পরবর্তী সময়ে প্রতারণা বা প্রতিহিংসার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কনটেন্ট একবার অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ফলে মানসিক বিপর্যয় থেকে শুরু করে সামাজিক লাঞ্ছনা—সবকিছুর শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীদের।
সাধারণ গ্রাহকরাও প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে আতঙ্কে ভুগছেন। কে কখন কোন তথ্য সংগ্রহ করছে, কোন অ্যাপ কীভাবে ডেটা ব্যবহার করছে—এই অনিশ্চয়তা এখন বড় এক উদ্বেগের কারণ। শুধু নারী নয়, শিশু ও প্রবীণদের জন্যও অনলাইন স্পেস দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। তাই নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন শুধু ব্যবহারকারীর দায়িত্ব নয়, অ্যাপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি বড় নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু অ্যাপ নির্মাতা নতুন নিরাপত্তা ফিচার যুক্ত করার কথা জানাচ্ছে। ব্যবহারকারীদের জন্য টাইম মেশিন ফিচারের মাধ্যমে যে কোনো সময় চ্যাট হিস্ট্রি মুছে ফেলার সুযোগ রাখা হচ্ছে। এতে পুরোনো কথোপকথন বা সংবেদনশীল তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট নিয়ন্ত্রণের সুবিধা দিয়ে অপরিচিত বা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের দূরে রাখার ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সিমকার্ড বাইন্ডিং ফিচার চালুর কথা বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সিম ও একটি ডিভাইসেই একটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যাবে। ফলে একাধিক ডিভাইস বা নম্বর থেকে একই অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশের ঝুঁকি কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা চালু হলে অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে জনপ্রিয় যোগাযোগ অ্যাপ ইমো সম্প্রতি চালু করেছে ‘ব্লক স্ক্রিনশটস ফর কলস’ নামের একটি ফিচার। ভিডিও কল চলাকালে যদি কেউ স্ক্রিনশট নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ভিডিও কলের সময় ব্যক্তিগত মুহূর্ত অননুমোদিতভাবে ধারণ করার সুযোগ থাকবে না। বিশেষ করে নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় এই ফিচারকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া কেউ যদি ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রেও নোটিফিকেশন অ্যালার্ট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে ব্যবহারকারী তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারবেন যে তাঁর কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে কি না। এই স্বচ্ছতা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অ্যাপ নির্মাতাদের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। ব্যবহারকারীদের নিজেদের দিক থেকেও সচেতন হতে হবে। অজানা লিংকে ক্লিক না করা, অপরিচিতদের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং নিয়মিত অ্যাপ আপডেট রাখা—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি শিশু ও কিশোরদের অনলাইন ব্যবহারেও অভিভাবকদের নজরদারি প্রয়োজন।
চলতি বছরে সাইবার ঝুঁকি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অপরাধীদের হাতেও শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। তাই নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়তে হলে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। সচেতন ব্যবহার, দায়িত্বশীল অ্যাপ নকশা এবং শক্তিশালী আইনগত কাঠামো—এই তিনটির সমন্বয়ই পারে অনলাইন জগতকে সবার জন্য নিরাপদ করে তুলতে।