প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনে জন্মহার ১৯৪৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দেশের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। সোমবার প্রকাশিত জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে জানা গেছে, ২০২৫ সালে চীনে মাত্র ৭৯ লাখ ২০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। এ হিসেবে প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে জন্মহার দাঁড়িয়েছে ৫.৬৩, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে রেকর্ড।
চীনে টানা চতুর্থ বছরের মতো জন্মহার কমে আসছে। যদিও ২০২৪ সালে সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। ২০২৫ সালে জন্মের সংখ্যা কমলেও মৃত্যু হার বেশি থাকার কারণে দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩.৩৯ মিলিয়ন কমে ১.৪ বিলিয়নে নেমেছে। এ পরিস্থিতি শ্রমশক্তি সংকট, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্যহীনতা চীনের জন্মহার হ্রাসের মূল কারণ। তরুণ প্রজন্ম সন্তান গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা এবং সন্তানের লালন-পালনের বাড়তি দায়িত্ব এই অনীহাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চীন সরকার জন্মহার বৃদ্ধির জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। শিশু ভাতা বৃদ্ধি, কর ছাড়, আবাসন সহায়তা, বিনামূল্যে প্রাক-স্কুল শিক্ষা প্রদানসহ বিভিন্ন প্রণোদনা চালু করা হলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সন্তান গ্রহণে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
চীনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন শুধু দেশীয় অর্থনীতির জন্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। শ্রমশক্তির হ্রাস এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্য, পেনশন এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে চাপ বৃদ্ধি পাবে। এটি দেশের উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি জন্মহার এই হারে কমতে থাকে, তবে চীনের জন্য জনসংখ্যাগত বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অপ্রতিরোধ্য হতে পারে। এতে শুধু শ্রমশক্তি সংকট নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তরুণদের পরিবার গঠনে অনীহা, উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এই সমস্যার মূল সূচক হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
চীনের এই জন্মহার সংকট বর্তমান প্রজন্মের জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও, সরকারি নীতি ও সামাজিক প্রণোদনা দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু আর্থিক প্রণোদনা যথেষ্ট নয়; সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন, পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য এবং বয়স্ক মানুষের যত্ন নিশ্চিতকরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের জনসংখ্যা হ্রাস ও জন্মহার কমে যাওয়ার এই তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ভূমিকা এবং শ্রমশক্তির প্রাপ্যতা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জন্মহার বৃদ্ধির জন্য কার্যকর এবং সমন্বিত নীতি গ্রহণে সময় নষ্ট করা যাবে না।
চীনের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক কাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তা অনুভূত হবে। তাই সরকারকে কেবল আর্থিক প্রণোদনা নয়, বরং সামাজিক সংস্কৃতি, পরিবার নীতি ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
চীনের জন্মহার হ্রাসের এই ইতিহাসি ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের উদাহরণ থেকে অন্যান্য দেশও সতর্ক হতে পারে, যেখানে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও শ্রমবাজারের চাপ জনসংখ্যা হ্রাসের জন্য প্রধান কারণ হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে, চীনের তরুণ প্রজন্মের সন্তান গ্রহণে আগ্রহ বৃদ্ধি করা, পরিবার নীতি পুনর্বিন্যাস এবং সামাজিক সহায়তা শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো চীনের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।