ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’: ১০০ কোটি ডলারে স্থায়ী সদস্যপদ, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’: ১০০ কোটি ডলারে স্থায়ী সদস্যপদ, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ শুধু গাজা সংকট মোকাবিলার উদ্যোগই নয়, বরং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে—এমন আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই পর্ষদে স্থায়ী সদস্যপদ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে দিতে হবে ১০০ কোটি ডলার অনুদান—এমন তথ্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

সম্প্রতি গাজায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ তদারক ও যুদ্ধোত্তর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে বিশ্বনেতাদের নিয়ে একটি নতুন শান্তি পর্ষদ গঠনের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এই পর্ষদের মূল লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগের আর্থিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শুরু থেকেই।

গাজা শান্তি পর্ষদের সনদ সম্পর্কে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন এই পর্ষদে স্থায়ী সদস্য হিসেবে থাকতে হলে এককালীন ১০০ কোটি ডলার অনুদান দিতে হবে। এই অর্থ সরাসরি গাজা পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে বলে সনদে উল্লেখ রয়েছে। তবে তিন বছরের জন্য মনোনীত অস্থায়ী সদস্যদের ক্ষেত্রে এই অনুদান বাধ্যতামূলক নয়। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সনদটি প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।

এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। হাঙ্গেরি ও ভিয়েতনাম প্রকাশ্যেই জানিয়েছে, তারা এই পর্ষদে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান, যিনি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত, শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার সিজার্তো রাষ্ট্রীয় বেতারে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, হাঙ্গেরি মনে করে গাজায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে নতুন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভিয়েতনামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তো লামও ট্রাম্পের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রাষ্ট্রের শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভিয়েতনামের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে ভারতও এই শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে বলে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়ায় তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। ভারতের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অস্ট্রেলিয়াকেও এই পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবটির বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে কোনো প্রতিশ্রুতি না দিলেও, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেন।

গত রোববার জর্ডান, গ্রিস, সাইপ্রাস ও পাকিস্তানও শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এর আগে কানাডা, তুরস্ক, মিসর, প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও আলবেনিয়াও আমন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে। তবে মোট কতটি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি।

ওয়াশিংটন সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই শান্তি পর্ষদের সদস্যদের একটি আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকের সময় এই ঘোষণা আসতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এমন ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় বার্তা দেবে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

গত ১০ অক্টোবর গাজায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে শান্তি পর্ষদের সদস্যদের দায়িত্ব হবে গাজায় পরবর্তী পদক্ষেপগুলো তদারক করা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি কমিটি গঠন, একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া অঞ্চলটির পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে।

শুক্রবার বিশ্বনেতাদের কাছে পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের ‘প্রতিষ্ঠাতা সদস্য’ হওয়ার আহ্বান জানান। চিঠিতে তিনি লেখেন, এই শান্তি পর্ষদ বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে এক সাহসী নতুন পথচলার সূচনা করবে। আমন্ত্রিত কয়েকজন নেতা সেই চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই শান্তি পর্ষদ জাতিসংঘের ১৫ সদস্যবিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হতে পারে। গাজা যুদ্ধ বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগের কারণে একাধিক প্রস্তাব আটকে যাওয়ায় জাতিসংঘের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ও অন্যান্য দাতাদের বড় অঙ্কের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় জাতিসংঘের প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

ট্রাম্প তাঁর আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ করেছেন, নিরাপত্তা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ২০ দফার গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাকে অনুমোদন দিয়েছে এবং সেই পরিকল্পনার মধ্যেই শান্তি পর্ষদ গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন কাঠামো গড়ে তোলার এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

এরই মধ্যে হোয়াইট হাউস শান্তি পর্ষদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বনেতাদের নিয়ে একটি নির্বাহী কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই কমিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা ও ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট গ্যাব্রিয়েল অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি ইসরায়েলি ব্যবসায়ী ও ধনকুবের ইয়াকির গ্যাবেও কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন।

তবে এই নির্বাহী কমিটি গঠনের বিষয়ে ইসরায়েল আপত্তি জানিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছাড়াই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা তাদের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের এমন প্রকাশ্য অসন্তোষকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ উদ্যোগ একদিকে যেমন গাজা পুনর্গঠনের আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন তুলছে। ১০০ কোটি ডলারের বিনিময়ে স্থায়ী সদস্যপদের প্রস্তাব শান্তি প্রতিষ্ঠার ধারণাকে কতটা নৈতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখবে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বিশ্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত