প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জীবনের তাগিদে প্রতিদিনই ঘর ছাড়তেন তাঁরা। মাথার ওপর ঋণের বোঝা, ঘরে শিশু সন্তান, বৃদ্ধ স্বজন—সব সামলাতে দিনমজুরির কাজই ছিল একমাত্র ভরসা। দল বেঁধে ভোরে বেরিয়ে পড়তেন পাশের জেলা মাদারীপুরে, সন্ধ্যার আগেই আবার ফিরে আসতেন আপন নীড়ে। কিন্তু গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সেই চেনা ফেরার পথই হয়ে উঠল তাঁদের জীবনের শেষ ঠিকানা। মাদারীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচ নারী দিনমজুর আর কোনো দিনই ফিরতে পারলেন না ঘরের চৌকাঠে।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মাদারীপুর সদরের মিলগেট এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের চাপায় প্রাণ হারান গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের পাইকেরবাড়ি গ্রামের পাঁচ নারী। তাঁরা হলেন শেফালী বাড়ৈ, দুলালী বাড়ৈ, আভা বাড়ৈ, অমিতা বাড়ৈ ও কামনা বিশ্বাস। বয়স ৪০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। জীবনের এই মধ্যগগনেই তাঁদের গল্প থেমে গেল এক মুহূর্তের দুর্ঘটনায়।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যায় মাদারীপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সার্বিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় ইজিবাইকটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। বাসের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই পাঁচ নারী নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান ইজিবাইকের চালক ও বাসের এক সুপারভাইজার। দুর্ঘটনায় অন্তত আরও ১০ জন যাত্রী আহত হন।
নিহত পাঁচ নারীই ইজিবাইকে করে কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। প্রত্যেকেই দিনমজুর। কৃষিজমিতে বীজ রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ধান কাটার মতো মৌসুমি কাজ করেই চলত তাঁদের সংসার। দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পেতেন, সেই টাকাতেই কোনোভাবে সন্তানদের মুখে ভাত তুলে দিতেন, ওষুধ কিনতেন, কখনো বা ঋণের কিস্তি দিতেন।
দুর্ঘটনার পর রাত দুইটার দিকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল থেকে পাঁচ নারীর মরদেহ একসঙ্গে একটি গাড়িতে করে পাঠানো হয় তাঁদের গ্রামের বাড়ি পাইকেরবাড়িতে। একসঙ্গে পাঁচটি লাশ ঢোকার সেই দৃশ্য দেখে পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। কান্না, আহাজারি আর নীরবতার ভারে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।
নিহত শেফালী বাড়ৈর ছেলে রনি বাড়ৈ (১৭) ঢাকায় একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে রাতে ছুটে এসেছেন বাড়িতে। চোখ ভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িতে থাকি না। কাজের জন্য দূরে থাকি। মা একাই সংসার চালাইত। তাই মাঝেমধ্যে কৃষিকাজ করতে যাইত। আমি যদি বাড়ি থাকতাম, মারে দূরে কামে পাঠাইতাম না। আমার মা তাহলে মরত না। এখন আমার বোনডারে কে দেখবে?’
শুধু শেফালীর পরিবার নয়, নিহত প্রতিটি পরিবারের গল্পই প্রায় একই। দুলালী বাড়ৈ ও আভা বাড়ৈ ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। অমিতা বাড়ৈর স্বামী অসুস্থ, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে পারেন না। আর কামনা বিশ্বাসের স্বামী পংকজ বিশ্বাস মারা গেছেন আগেই। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে কামনার জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। তাঁর ছোট ছেলে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। থাকার মতো ভিটেমাটিও ঠিকমতো নেই।
পাইকেরবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা অসিম বিশ্বাস বলেন, ‘এই পাঁচটা পরিবার খুবই গরিব। কামনার ছেলেমেয়েগুলা এখন কী করবে, কেউ জানে না। দাহ করার মতো টাকাও কারও ছিল না। আমরা গ্রাম থেকে চাঁদা তুলে সৎকারের ব্যবস্থা করছি। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা সুজিৎ মৃধা জানান, এই গ্রামের দরিদ্র নারীরা প্রায়ই দল বেঁধে মাদারীপুরের কৃষিজমিতে কাজ করতে যেতেন। তিনি বলেন, ‘দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে ফিরতেন ঠিকই, কিন্তু মুখে একটা তৃপ্তির হাসি থাকত—আজকের রোজগারটা নিয়ে। দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচজন মারা যাওয়ায় পুরো গ্রামটাই যেন ভেঙে পড়েছে।’
আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত পাঁচ নারীর সৎকার সম্পন্ন হয়নি। স্বজনেরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় মানুষজনের সহায়তায় কোনোমতে দাহকার্য সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। প্রশাসনিক কোনো তাৎক্ষণিক সহায়তা এখনো পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
মস্তফাপুর হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুন আল রশিদ বলেন, দুর্ঘটনার পর নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাইওয়ে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক পালিয়ে গেছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিদিনের মতোই শ্রমজীবী মানুষেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে নামছেন। একটি অসতর্ক মুহূর্ত, একটি বেপরোয়া যান তাঁদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। নিহত পাঁচ নারীর পরিবারের জন্য এই ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। সন্তানদের শূন্য চোখ, স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর একটি গ্রামের স্তব্ধতা—সব মিলিয়ে এই দুর্ঘটনা শুধু একটি খবর নয়, এটি গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের নিত্যদিনের অনিরাপদ জীবনের নির্মম প্রতিচ্ছবি।