একীভূত ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা স্থগিত, আস্থার সংকটে আমানতকারীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৭ বার
একীভূত ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা স্থগিত, আস্থার সংকটে আমানতকারীরা

প্রকাশ: ১৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য কোনো ধরনের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তের পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অসংখ্য আমানতকারী। কেউ কেউ সরাসরি শাখা ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে একীভূত হওয়া এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক আমানতকারীর জন্য টানা দুই বছর মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাই নয়, বরং ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

জানা গেছে, একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তদারকির ঘাটতি এবং ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের ফলে যে লোকসান সৃষ্টি হয়েছে, তার দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো ন্যায্য নয়। বিশেষ করে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১৪ জানুয়ারি সব ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সব ধরনের আমানত ‘মুনাফাবিহীন’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পরপরই আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আজ মুনাফা বন্ধ হলে আগামী দিনে মূলধন ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে একমত নেই সবাই। কেউ কেউ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থা, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে নেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পক্ষে মত দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা।

ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সাধারণত সঞ্চয়ী ও মেয়াদি আমানত গ্রহণ করে ‘মুদারাবা’ পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতিতে আমানতকারী মূলধন সরবরাহকারী বা ‘সাহিব-আল-মাল’ হিসেবে বিবেচিত হন এবং ব্যাংক থাকে ‘মুদারিব’ বা ব্যবস্থাপক হিসেবে। চুক্তি অনুযায়ী, মুনাফা হলে তা নির্দিষ্ট হারে বণ্টিত হয়। তবে ব্যবসায় স্বাভাবিক লোকসান হলে আমানতকারীকে সেই লোকসানের অংশ বহন করতে হয়। কিন্তু ব্যাংকের অবহেলা, অসদাচরণ বা বিশ্বাসভঙ্গের কারণে লোকসান হলে তার পুরো দায়ভার ব্যাংকের ওপর বর্তায়।

এ ক্ষেত্রেই উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তদন্তে উঠে এসেছে, এসব ব্যাংকের বিতরণ করা এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকার ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ লোকসানের বড় অংশই এসেছে অব্যবস্থাপনা, তদারকির অভাব ও বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে শরিয়াহ মানদণ্ড অনুযায়ী এই লোকসানের দায় কি আদৌ আমানতকারীদের ওপর চাপানো যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিষয়টি নিয়ে সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ডে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। বোর্ডের সদস্য ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং শরিয়াহর একাধিক দিক এতে জড়িত। পরিপূর্ণ মতামত দিতে আরও সময় লাগবে। বিভিন্ন দিক থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সবকিছু বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এদিকে, সমকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক, শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আরেকটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক একজন এমডির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে একমত পোষণ করেন যে শরিয়াহ মানদণ্ড অনুযায়ী কোনোভাবেই মুনাফা না দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, যদি প্রমাণিত হয় যে লোকসানের পেছনে ব্যাংকের অবহেলা বা বিশ্বাসভঙ্গ রয়েছে, তাহলে আমানতকারীদের মুনাফা বঞ্চিত করা তো দূরের কথা, বরং ব্যাংককেই দায় নিতে হবে।

আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগের পাশাপাশি ক্ষোভও বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, ইসলামী ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাস ও নিরাপত্তার কারণে। এখন সেই বিশ্বাসেই চিড় ধরছে। কেউ কেউ ইতোমধ্যে বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকদের মতে, এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমানত প্রত্যাহারের চাপ তৈরি হতে পারে, যা সদ্য একীভূত ব্যাংকের জন্য আরও বড় সংকট ডেকে আনবে।

সব মিলিয়ে, একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের দুই বছরের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি এখন আস্থা, শরিয়াহ নীতিমালা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন দেশের লাখো আমানতকারী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত