প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশগুলোর একটি চীনে জনসংখ্যা হ্রাসের ধারা থামছেই না। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও দেশটির মোট জনসংখ্যা কমেছে। এর মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থ বছরের মতো জনসংখ্যা হ্রাসের নজির দেখা গেল চীনে। এই প্রবণতা শুধু সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়, বরং দেশটির সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশটির জনসংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ লাখ ৯০ হাজার কমে বর্তমানে প্রায় ১৪০ কোটি ৫০ লাখে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দশক ধরে অব্যাহত জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর এই ধারাবাহিক পতন চীনের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও উদ্বেগজনক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়া এবং দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির যুগপৎ চাপ দেশটিকে এক জটিল বাস্তবতার মুখে ফেলেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৭৯ লাখ ২০ হাজার শিশু, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম। এ সংখ্যা শুধু সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে নয়, বরং দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত কম। বিপরীতে, একই বছরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখে, যা ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ। ফলে জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধান আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। প্রতি এক হাজার জনে জন্মহার নেমে এসেছে মাত্র ৫ দশমিক ৬৩-এ, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের দেশের মধ্যেই অন্যতম নিম্ন পর্যায়ের হার।
উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জনসংখ্যাবিদ এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ২০২৫ সালের জন্মহার কার্যত ১৭৩৮ সালের স্তরের কাছাকাছি, যখন চীনের মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ কোটি। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার যুগে এসে এমন জন্মহার একটি গভীর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
২০২২ সাল থেকেই চীনের জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে দেশটির মানুষ দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। এই হার আগামী এক দশকের মধ্যেই আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটিতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এর অর্থ হলো, কর্মক্ষম বয়সের বিপুল সংখ্যক মানুষ ধীরে ধীরে শ্রমবাজার ছাড়বে, যা শিল্প ও সেবাখাতে বড় ধরনের জনশক্তির ঘাটতি তৈরি করবে।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের পেনশন ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে বাড়তি পেনশন ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হবে, যা রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এই চাপ সামাল দিতে চীন সরকার ইতিমধ্যে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষদের অবসরের বয়স ৬৩ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৫৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে নেওয়া, তবে সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিয়ে ও পরিবার গঠনের প্রতি তরুণ প্রজন্মের অনীহা। ২০২৪ সালে চীনে বিয়ের হার রেকর্ড ২০ শতাংশ কমে যায়, যা জনসংখ্যা সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও ২০২৫ সালে বিয়ের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার পর বছরের শেষ দিকে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, তবু সামগ্রিকভাবে এই হার এখনো অতীতের তুলনায় অনেক কম।
এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ‘এক সন্তান নীতি’ চীনের সমাজে গভীর প্রভাব রেখে গেছে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা এই নীতির ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে ছোট পরিবার ধারণা চীনা সমাজে গেঁথে গেছে। অনেক দম্পতির কাছেই একাধিক সন্তান নেওয়া এখন আর স্বাভাবিক বা প্রয়োজনীয় বলে মনে হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিটি বাতিলের পরও মানুষের মানসিকতা ও সামাজিক কাঠামোয় যে পরিবর্তন এসেছে, তা সহজে পাল্টানো যাচ্ছে না।
শহরাঞ্চলে বসবাসের ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, শিক্ষার উচ্চ খরচ এবং চাকরির অনিশ্চয়তাও সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ দম্পতিরা মনে করছেন, সন্তানের সঠিক লালন-পালন ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে যে ব্যয় প্রয়োজন, তা বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন। ফলে অনেকেই সন্তান নেওয়া বিলম্বিত করছেন বা একেবারেই সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এই সংকট মোকাবিলায় চীন সরকার একাধিক বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, শুধু জন্মহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ বছর চীন সরকার প্রায় ২ হাজার ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় শিশু ভাতা কর্মসূচি, যা গত বছর থেকেই ধাপে ধাপে চালু হয়েছে। এই ভাতার মাধ্যমে শিশু লালন-পালনের প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে সরকার।
এ ছাড়া ২০২৬ সাল থেকে গর্ভবতী নারীদের সব চিকিৎসা ব্যয় সরকারি বিমার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ব্যয়বহুল আইভিএফ পদ্ধতিও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপ তরুণ দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও উৎসাহিত করবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ বর্তমানে চীনের প্রজনন হার একজন নারী গড়ে মাত্র এক সন্তানে নেমে এসেছে, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি। এই হার দীর্ঘ সময় ধরে এত নিচে থাকলে জনসংখ্যার কাঠামোতে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সন্তান জন্ম দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন নারীর সংখ্যা তিন-চতুর্থাংশ কমে ১০ কোটির নিচে নেমে আসতে পারে।
চীনের জনসংখ্যা সংকট এখন আর কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রভাবের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। একদিকে শ্রমশক্তির ঘাটতি, অন্যদিকে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ—এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। টানা চার বছর জনসংখ্যা হ্রাসের এই প্রবণতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, চীনের সামনে এখন সময়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক পরীক্ষাগুলোর একটি দাঁড়িয়ে আছে।