এলপিজি আমদানিতে শীর্ষে মেঘনা গ্রুপ, পাল্টে গেল বাজার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
এলপিজি আমদানিতে শীর্ষে মেঘনা গ্রুপ, পাল্টে গেল বাজার

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি খাতে এক দশক ধরে চলা নেতৃত্বের সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিন এই খাতের শীর্ষস্থান ধরে রাখা বসুন্ধরা গ্রুপ এখন নেমে এসেছে তালিকার অনেক নিচে, আর মাঝখানে উত্থান-পতনের ইতিহাস পেরিয়ে প্রথমবারের মতো বাজারের শীর্ষে উঠে এসেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড। এলপিজি আমদানি ও বাজার অংশীদারিত্ব—দুই ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তন শুধু একটি কোম্পানির সাফল্যের গল্প নয়, বরং দেশের জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা, নীতিনির্ভরতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ছয় মাসে দেশে মোট এলপিজি আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮৩ হাজার টন। এই আমদানির বড় অংশই করেছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। মোট ১৬টি কোম্পানি সরাসরি এলপিজি আমদানি করেছে, আর বাকি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে সিলিন্ডারে ভরে বাজারে সরবরাহ করছে। এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো—এই সাড়ে ছয় মাসে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি একাই আমদানি করেছে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার টন এলপিজি, যা মোট আমদানির প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো বাজারের শীর্ষে উঠে এসেছে।

এলপিজি খাতে নেতৃত্বের এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। চার বছর আগে পর্যন্ত বসুন্ধরা গ্রুপই ছিল এলপিজি আমদানির শীর্ষে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তারা প্রায় দুই লাখ টন এলপিজি আমদানি করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল। কিন্তু পরের বছরই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে ওমেরা পেট্রোলিয়াম শীর্ষে উঠে আসে, আর বসুন্ধরা নেমে যায় চতুর্থ স্থানে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ওমেরা এই অবস্থান ধরে রাখে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসেই সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি।

মেঘনা গ্রুপের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে আমদানির অনুমোদন বৃদ্ধি, দ্রুত স্পটমার্কেট থেকে গ্যাস সংগ্রহের সক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় আগাম প্রস্তুতি। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, এলপিজি আমদানি বাড়াতে সরকারি অনুমোদন একটি বড় বিষয়। সম্প্রতি মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির আমদানির অনুমোদন বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে তারা দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি সংগ্রহ করতে পারছে। সামনে রমজান মাসকে সামনে রেখে যেন বাজারে কোনো সংকট না তৈরি হয়, সে লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাজার অংশীদারিত্বের দিক থেকে সবচেয়ে নাটকীয় পতন ঘটেছে একসময়কার শীর্ষস্থানীয় বসুন্ধরা গ্রুপের। বর্তমানে তাদের বাজার অংশীদারি নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে, আর আমদানির তালিকায় অবস্থান দ্বাদশ। অন্যদিকে, ওমেরা পেট্রোলিয়াম বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের বাজার অংশীদারি প্রায় ১২ শতাংশ। তবে সম্প্রতি ফরাসি বহুজাতিক কোম্পানি টোটালগ্যাসের বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণ করায় সামনে ওমেরার বাজার অংশীদারি আবার বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে অর্থবছর শেষে শীর্ষস্থানের হিসাব-নিকাশ আবারও বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন ও তুলনামূলকভাবে দ্রুত বেড়ে ওঠা কোম্পানিগুলোর উত্থান। ইউনাইটেড গ্রুপ ও তুরস্কের আইগ্যাসের যৌথ উদ্যোগে গড়া ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি লিমিটেড গত তিন বছরে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। তাদের বাজার অংশীদারি বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, যেখানে গত অর্থবছরে তারা ছিল অষ্টম স্থানে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে গড়া যমুনা স্পেকটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড, যারা এই সময়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করে প্রায় ১৪ শতাংশ বাজার অংশীদারি ধরে রেখেছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব সিলিন্ডার প্ল্যান্ট রয়েছে এবং ২৩টি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি আমদানির সক্ষমতা আছে। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের এলপিজির ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর এবং এই আমদানির বড় অংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি হয়েছিল প্রায় ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন, যেখানে সরকারি খাতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৯ হাজার টনের কিছু বেশি। অর্থাৎ সরকারি খাতের বাজার অংশীদারি প্রায় ১ শতাংশে সীমাবদ্ধ।

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিজির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানির পরিমাণও বাড়ছে, কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে খরচ কমানো যাচ্ছে না। বর্তমানে বেশিরভাগ কোম্পানি ছোট জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি করে। ছোট জাহাজে পরিবহনের ফলে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আমিরুল হকের মতে, বড় জাহাজে এলপিজি আনার মতো টার্মিনাল তৈরি করা গেলে টনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ ডলার পর্যন্ত খরচ সাশ্রয় সম্ভব। এই সাশ্রয়ের সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছেই পৌঁছাতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে বড় এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য সরকারের জমি বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তা জরুরি। ৫০ হাজার টনের মতো বড় জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে এলপিজি সংকট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে। নীতিসহায়তা না বাড়লে খরচ কমানো কঠিন, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়ে।

সব মিলিয়ে, এলপিজি আমদানিতে মেঘনা গ্রুপের শীর্ষে ওঠা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়, বরং দেশের জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়। এই পরিবর্তন দেখিয়ে দিচ্ছে যে নীতিগত অনুমোদন, অবকাঠামো ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে কারা থাকবে শীর্ষে, আর কারা হারাবে তাদের অবস্থান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত