মিশিগানে তুষারঝড়ে শতাধিক গাড়ির ভয়াবহ সংঘর্ষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে তুষারঝড়ে শতাধিক গাড়ির সংঘর্ষ

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে তীব্র তুষারঝড় ও ‘হোয়াইটআউট’ পরিস্থিতির মধ্যে একযোগে শতাধিক গাড়ির সংঘর্ষের ঘটনা দেশটির শীতকালীন দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে ইন্টারস্টেট–১৯৬ মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তঃরাজ্য সড়ক, ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী। তবে আশার কথা, এত বড় দুর্ঘটনার পরও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, যদিও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

ওটাওয়া কাউন্টি শেরিফের দপ্তর জানায়, গ্র্যান্ড র‍্যাপিডস শহর থেকে প্রায় ২৪ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে সকাল ১০টা ২০ মিনিটের আগেই দুর্ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটতে শুরু করে। হাডসনভিল ও জিল্যান্ড শহরের মধ্যবর্তী প্রায় ১০ মাইল সড়কজুড়ে উভয় দিকের যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। মুহূর্তের মধ্যেই সাদা বরফে ঢেকে যায় চারপাশ, চোখের সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না—এই ‘হোয়াইটআউট’ পরিস্থিতিই মূলত দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করেই তুষারপাতের তীব্রতা বেড়ে যায় এবং প্রবল বাতাসের কারণে দৃশ্যমানতা নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায়। সামনের গাড়িটি কোথায় আছে, সেটিই বোঝা যাচ্ছিল না। প্রথম একটি বা দুটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে থেমে যাওয়ার পর পেছন থেকে আসা যানবাহনগুলো একের পর এক ধাক্কা খেতে থাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এটি রূপ নেয় বিশাল ‘চেইন-রিঅ্যাকশন’ দুর্ঘটনায়।

ওটাওয়া কাউন্টি শেরিফের দপ্তরের প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, সংঘর্ষে অন্তত দুই ডজন সেমিট্রাক বা বড় মালবাহী ট্রাক জড়িত ছিল। এসব ভারী যানবাহনের সঙ্গে ছোট গাড়ি ও এসইউভির সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হয়।

আহত অন্তত ১০ জনকে আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কারও আঘাতই প্রাণঘাতী নয়। অনেকেই হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার আঘাত পেয়েছেন, তবে ঠান্ডা ও আতঙ্কের কারণে কয়েকজনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে আটকে পড়া অনেক চালক ও যাত্রীকে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা গরম পোশাক ও খাবার সরবরাহ করেন।

মিশিগান রাজ্যের কর্মকর্তারা জানান, ওই দিন পুরো রাজ্যজুড়েই প্রতিকূল আবহাওয়া বিরাজ করছিল। তীব্র তুষারপাত, প্রবল বাতাস এবং হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা সড়ক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তোলে। এর আগেই ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের গ্র্যান্ড র‍্যাপিডস কার্যালয় থেকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। বিশেষ করে গ্রেট লেকস অঞ্চলে আর্কটিক শৈত্যপ্রবাহের অংশ হিসেবে ভারী তুষার ও বরফের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

আবহাওয়াবিদরা জানান, গ্রেট লেকস অঞ্চলে ‘লেক-ইফেক্ট স্নো’ নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার কারণে হঠাৎ করে তুষারপাতের তীব্রতা বেড়ে যায়। ঠান্ডা আর্কটিক বাতাস তুলনামূলক উষ্ণ লেকের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে এই ধরনের ভারী তুষারপাত হয়। এর সঙ্গে প্রবল বাতাস যোগ হলে সৃষ্টি হয় ‘হোয়াইটআউট’, যেখানে দৃশ্যমানতা কয়েক ফুটের বেশি থাকে না।

দুর্ঘটনার পরপরই রাজ্য পুলিশ, শেরিফের দপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও মেডিকেল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করে। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনগুলো সরাতে ভারী ক্রেন ব্যবহার করা হয়। বরফ ও তুষার পরিষ্কারের জন্য স্নো-প্লাও ও লবণ ছিটানোর যান মোতায়েন করা হয়। কয়েক ঘণ্টার নিরলস প্রচেষ্টার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সড়কটি পুনরায় যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

ওটাওয়া কাউন্টি শেরিফের ক্যাপ্টেন জেক স্পার্কস সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের জানান, “পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। দৃশ্যমানতা কম থাকায় উদ্ধার কাজ ধীরগতিতে করতে হয়েছে। তবে আমরা সৌভাগ্যবান যে কোনো প্রাণহানি হয়নি।” তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ তদন্তাধীন রয়েছে, তবে প্রাথমিকভাবে প্রতিকূল আবহাওয়া ও পিচ্ছিল সড়ককেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রায় সড়কে দ্রুত বরফ জমে যায়, যাকে ‘ব্ল্যাক আইস’ বলা হয়। এটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু গাড়ির টায়ার এর ওপর পড়লেই নিয়ন্ত্রণ হারায়। এমন পরিস্থিতিতে চার চাকার গাড়ি বা আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও অনেক সময় কার্যকর থাকে না। একবার গতি বেড়ে গেলে বা হঠাৎ ব্রেক চাপলে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই দুর্ঘটনা আবারও শীতকালীন ভ্রমণের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর শীতকালীন ঝড় ও তুষারপাতের কারণে হাজার হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে যাত্রা শুরু করা, অতিরিক্ত গতি এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখাই বড় দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা হঠাৎ করেই আবহাওয়ার এমন অবনতি আশা করেননি। কেউ কেউ অফিস বা জরুরি কাজে বের হয়েছিলেন, আবার কেউ দীর্ঘ ভ্রমণে ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় অনেক গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকলেও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি সামাল দেন। এই মানবিক দিকটি দুর্ঘটনার ভয়াবহতার মাঝেও কিছুটা স্বস্তির বার্তা দেয়।

মিশিগান পরিবহন বিভাগ জানিয়েছে, শীতকালজুড়ে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। চালকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে যাত্রা পরিকল্পনা করতে, গাড়িতে জরুরি সরঞ্জাম রাখতে এবং প্রয়োজনে ভ্রমণ স্থগিত রাখতে। বিশেষ করে তীব্র তুষারঝড়ের সময় অপ্রয়োজনীয় যাত্রা এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার চরমতা বাড়ছে। একদিকে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে হঠাৎ তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ও তুষারঝড়—এই বৈপরীত্য ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সড়ক অবকাঠামো, জরুরি সেবা এবং জনসচেতনতা—সবকিছুই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

মিশিগানের ইন্টারস্টেট–১৯৬–এ ঘটে যাওয়া এই শতাধিক গাড়ির সংঘর্ষ তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং শীতকালীন দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রাণহানি না ঘটলেও এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রকৃতির সামনে মানুষের অসতর্কতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত