তৃতীয় দিনের দাবানলে জ্বলছে চিলি, শহর পরিণত ছাইয়ে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৭ বার
চিলির ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতি

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি আবারও এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। দক্ষিণ চিলিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো ভয়াবহ দাবানল জ্বলছে, যার তাণ্ডবে একের পর এক শহর কার্যত মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বসেছে। উষ্ণ তাপমাত্রা, দীর্ঘ খরা এবং প্রবল বাতাস দাবানলকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শনিবার রাজধানী সান্তিয়াগো থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দক্ষিণে নুবল ও বায়োবায়ো অঞ্চলে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। শুরুতে এটি সীমিত পরিসরে থাকলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ে আগুন যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরের সমান বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শহরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে গেছে।

চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, কিছু এলাকায় আগুন আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও বেশ কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি এখনো “অত্যন্ত সক্রিয় ও বিপজ্জনক” অবস্থায় রয়েছে। তিনি জানান, বায়োবায়ো সংলগ্ন আরাউকানিয়া অঞ্চলেও নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

নুবল ও বায়োবায়ো—এই দুই অঞ্চলকে সরকারিভাবে দুর্যোগ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। পুড়ে যাওয়া গাড়ি, গলিত ধাতু, ধসে পড়া বাড়িঘর আর কালো ছাইয়ের স্তূপের মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী টহল দিচ্ছে। অনেক এলাকায় মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দাবানলের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে উপকূলীয় ও পাহাড়ি বসতিগুলোতে। লিরকেন বন্দর শহরের বাসিন্দা ইয়াগোরা ভাসকেজ এএফপিকে জানান, আগুন যখন তার পাড়ার দিকে ধেয়ে আসে, তখন পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি বলেন, “আমি আগুনের শব্দ শুনে ঘুম থেকে উঠি। চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর আগুন। আমি ছেলেকে নিয়ে দৌড়ে পালাই, আর আমার ভাই কুকুরটাকে বাঁচাতে ফিরে যায়।” তিনি জানান, ২০১০ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্প ও সুনামির পর উপকূল ছেড়ে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন। “তখন পানি আমাদের সবকিছু নিয়ে গিয়েছিল, এবার আগুন,” বলেন তিনি।

একই ধরনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা জানান ৫৩ বছর বয়সী মারেলি তোরেস। সুনামির পর উপকূল ছেড়ে এসে যে দুইতলা বাড়িতে তিনি নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, সেটি এবার আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে তিনি বলেন, “ভূমিকম্পে অনেক ক্ষতি হয়েছিল, কিন্তু এর সঙ্গে এর কোনো তুলনা নেই। সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল।”

সোমবার নুবল ও বায়োবায়ো অঞ্চলে সাড়ে তিন হাজারের বেশি দমকলকর্মী আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা। হেলিকপ্টার ও ফায়ারফাইটিং বিমান দিয়ে আকাশপথে পানি ও অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক ছিটানো হচ্ছে। যদিও দিনের বেলায় তাপমাত্রা কিছুটা কমে প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে, তবু প্রবল বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দাবানলের এই ভয়াবহতা নতুন কিছু নয় চিলির জন্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির শুষ্ক ও উষ্ণ মৌসুমে দক্ষিণ-মধ্য চিলিতে দাবানলের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সান্তিয়াগোভিত্তিক সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স রিসার্চের ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী খরা, উচ্চ তাপমাত্রা এবং অনিয়ন্ত্রিত বন ব্যবস্থাপনা এই অঞ্চলে চরম দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যিক বনায়নের জন্য ব্যবহৃত পাইন ও ইউক্যালিপটাস গাছ আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। এসব গাছ সহজেই দাহ্য এবং প্রবল বাতাসে আগুনকে আরও দূরে ছড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্রামীণ বসতি সম্প্রসারণ, যা বনাঞ্চলের খুব কাছাকাছি চলে আসায় মানুষের জীবন ও সম্পদ আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

চিলি এর আগেও দাবানলের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিনা দেল মার শহরের কাছে একাধিক দাবানলে ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তার আগেও ২০১৬–১৭ এবং ২০২২–২৩ মৌসুমে নজিরবিহীন পরিমাণ বনভূমি আগুনে পুড়ে যায়। এসব ঘটনার পরও দাবানল প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো যথেষ্ট নয় বলে সমালোচকদের মত।

এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্য অংশেও দাবানলের প্রভাব পড়ছে। আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ১৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গোটা অঞ্চলে জলবায়ু সংকট আরও গভীর হলে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় আরও ঘন ঘন ও আরও ভয়াবহ আকারে দেখা দিতে পারে।

চিলির এই দাবানল শুধু একটি দেশের সংকট নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নগ্ন বাস্তব চিত্র। আগুনে পুড়ে যাওয়া শহর, ঘরহারা মানুষ আর প্রাণহানির মিছিল বিশ্ববাসীকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে চিলি ও বিশ্ব কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত