নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরলেন জামায়াত আমির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা দিলেন জামায়াত আমির

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে চায়, যেখানে বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে এবং রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানবিকতা ও ন্যায়বোধ। বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং আশার রাজনীতি, নিরাময় ও ঐক্যই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের মূল শক্তি।

মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট–২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল ৯টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সামিটে দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, নীতিনির্ধারক, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিরা অংশ নেন। দিনব্যাপী এই সামিটে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সমাজনীতি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরা হয়।

ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, যেখানে আধুনিক বাজার অর্থনীতি কার্যকর থাকবে, তবে তা হবে নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার ভাষায়, “উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা ন্যায়, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।” তিনি বলেন, প্রশাসনিক কাঠামো হবে জবাবদিহিমূলক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং জনগণের কল্যাণে কাজ করবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন বাংলাদেশে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকবে না। প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ পাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে তোলা।

নারীর ক্ষমতায়ন ও অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীতে নারীদের অংশগ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। বর্তমানে দলের মোট সদস্যের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে নারীদের কেবল ভোটার বা সমর্থক হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে দেখা হবে।

ডা. শফিকুর রহমান জানান, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষায় নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র ও রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণে যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা রয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হবে। তার মতে, নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো সমাজই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না।

তরুণ প্রজন্মকে রাষ্ট্র সংস্কারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে তা রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। নতুন বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় যুব কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে তরুণদের রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের মূল শক্তিতে পরিণত করা হবে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে জামায়াত আমির একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে, যাতে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত না হয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে একটি উন্মুক্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, যা বিনিয়োগে আস্থা তৈরি করবে।

শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। তার মতে, এসএমই খাত শক্তিশালী হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন থাকবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কৃষি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষিকে উপেক্ষা করে কোনো দেশ টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। কৃষির আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাকে তিনি নতুন বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্য। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর দলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য রয়েছেন, যারা দেশ গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। তার মতে, ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছাড়া একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কোনো দেশ একা এগোতে পারে না। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে বৈদেশিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে নতুন বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতি।

সামিটে উপস্থিত বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ ও রিসোর্স পারসনদের ধন্যবাদ জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি বিভাজনের সময় নয়; বরং একটি সুন্দর, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়। তার ভাষায়, ঐক্যের মধ্য দিয়েই একটি সমৃদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত