প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে হোয়াটসঅ্যাপ। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক যোগাযোগ—সবখানেই এই মেসেজিং অ্যাপটির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছেন। এত বিশাল ব্যবহারকারীর উপস্থিতির কারণে সাইবার অপরাধীদের নজরেও রয়েছে এই প্ল্যাটফর্মটি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ব্রাউজারভিত্তিক অ্যাকাউন্ট হাইজ্যাক, কনট্যাক্ট অনুসন্ধান ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা ও নিরাপত্তা সেটিংস সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নেয় সাইবার অপরাধীরা। অথচ হোয়াটসঅ্যাপের ভেতরেই এমন বেশ কিছু নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা–সংক্রান্ত সুবিধা রয়েছে, যেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রতারণা ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রযুক্তিবিশ্লেষকদের মতে, এসব ফিচার শুধু জানা থাকলেই হবে না, বরং নিয়মিত আপডেটের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো কার্যকরভাবে চালু রাখাও জরুরি।
হোয়াটসঅ্যাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সুবিধা হলো প্রাইভেসি চেকআপ টুল। এই টুল ব্যবহারকারীদের জন্য একটি ধাপে ধাপে নির্দেশনামূলক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে খুব সহজেই নিজের অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেটিংসের প্রাইভেসি অংশে থাকা এই টুল ব্যবহার করে কে আপনার প্রোফাইল ছবি, নাম, পরিচিতি তথ্য, স্ট্যাটাস কিংবা সর্বশেষ অনলাইন উপস্থিতি দেখতে পারবে—তা নির্ধারণ করা যায়। একই সঙ্গে কে আপনাকে গ্রুপে যুক্ত করতে পারবে বা সরাসরি বার্তা পাঠাতে পারবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই টুলটি ব্যবহার করলে অচেনা ব্যক্তি বা সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট থেকে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ অনেকটাই কমে যায়।
ডিজঅ্যাপিয়ারিং মেসেজ সুবিধাটি বর্তমানে নিরাপত্তা–সচেতন ব্যবহারকারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। যদিও হোয়াটসঅ্যাপে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন থাকায় বার্তা আদান–প্রদানের সময় তথ্য সুরক্ষিত থাকে, তবে ফোন বা কম্পিউটার অন্যের হাতে চলে গেলে সংরক্ষিত বার্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে ডিজঅ্যাপিয়ারিং মেসেজ কার্যকর ভূমিকা রাখে। নির্দিষ্ট সময় পর—যেমন ২৪ ঘণ্টা, ৭ দিন বা ৯০ দিন—বার্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাওয়ায় সংবেদনশীল তথ্য দীর্ঘদিন ডিভাইসে থেকে যায় না। ব্যক্তিগত কিংবা অফিসিয়াল আলাপের ক্ষেত্রে এই সুবিধা তথ্য ফাঁসের আশঙ্কা কমায় বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট সুরক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো টু স্টেপ ভেরিফিকেশন। যেহেতু হোয়াটসঅ্যাপ মূলত ফোন নম্বরনির্ভর একটি অ্যাপ, তাই নম্বরটি দখল হয়ে গেলে পুরো অ্যাকাউন্টই ঝুঁকিতে পড়ে। টু স্টেপ যাচাইকরণ চালু থাকলে নতুন কোনো ডিভাইসে অ্যাকাউন্ট লগইন করতে অতিরিক্ত একটি পিন নম্বর দিতে হয়। এতে করে শুধু এসএমএস কোড পেলেই কেউ অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারে না। পাশাপাশি একটি ই–মেইল ঠিকানা যুক্ত করলে প্রয়োজনে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার সহজ হয়। সম্প্রতি পাসকি সুবিধা চালু হওয়ায় বায়োমেট্রিক বা ডিভাইসভিত্তিক নিরাপত্তার মাধ্যমে আরও সুরক্ষিতভাবে লগইন সম্ভব হচ্ছে।
অনেক সময় দেখা যায়, হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা এনক্রিপ্টেড হলেও ফোনের নোটিফিকেশন স্ক্রিনে বার্তার অংশ দেখা যায়। এতে আশপাশের কেউ সহজেই ব্যক্তিগত কথোপকথনের কিছু অংশ দেখে ফেলতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে অ্যাপ লক সুবিধা অত্যন্ত কার্যকর। অ্যাপ লক চালু করলে আঙুলের ছাপ, মুখের শনাক্তকরণ বা টাচ আইডি ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ খোলা যায় না। আরও এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে চ্যাট লক সুবিধা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট চ্যাট আলাদা সুরক্ষিত ফোল্ডারে রাখা যায়। এতে করে ফোন অন্যের হাতে গেলেও সংবেদনশীল কথোপকথন নিরাপদ থাকে।
হোয়াটসঅ্যাপের অ্যাডভান্সড প্রাইভেসি সেটিংস অনেক ব্যবহারকারীই পুরোপুরি কাজে লাগান না। অথচ এই সেটিংসগুলোই সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক করা, কলের সময় আইপি ঠিকানা গোপন রাখা কিংবা লিঙ্ক প্রিভিউ বন্ধ করার মতো সুবিধা এসব সেটিংসে রয়েছে। যদিও এসব ফিচার চালু করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কলের মান সামান্য কমতে পারে, তবে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মত প্রযুক্তিবিশ্লেষকদের।
এনহ্যান্সড চ্যাট প্রাইভেসি ফিচারটি তুলনামূলক নতুন হলেও এর কার্যকারিতা বেশ উল্লেখযোগ্য। এই সুবিধা চালু থাকলে চ্যাট এক্সপোর্ট সীমিত করা যায়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি ও ভিডিও ডাউনলোড বন্ধ হয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোনো কাজে বার্তা ব্যবহার করা যায় না। প্রতিটি চ্যাটের জন্য আলাদাভাবে এই সেটিংস প্রয়োগ করা সম্ভব হওয়ায় ব্যবহারকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা বাড়াতে পারেন। তবে পুরোনো সংস্করণের অ্যাপে সব ক্ষেত্রে এই ফিচার পুরোপুরি কার্যকর নাও হতে পারে।
রিড রিসিপ্ট ফিচারটি অনেকের কাছে সাধারণ মনে হলেও গোপনীয়তার দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। নীল টিক চিহ্নের মাধ্যমে বার্তা পড়া হয়েছে কি না বোঝা যায়। এই সুবিধা বন্ধ করলে প্রাপক জানতে পারবেন না আপনি বার্তা পড়েছেন কি না। এতে করে অপ্রয়োজনীয় চাপ বা সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক কৌশল এড়ানো সম্ভব হয়। যদিও এতে নিজেও অন্যের রিড রিসিপ্ট দেখতে পারবেন না, তবু ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অনেকেই এটি বন্ধ রাখেন।
মিডিয়া কন্ট্রোল সেটিংস ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ডিফল্টভাবে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পাওয়া ছবি ও ভিডিও ফোনের গ্যালারিতে সংরক্ষিত হয়, যা অন্য কেউ ফোন ব্যবহার করলে সহজেই দেখতে পারে। এই অপশন বন্ধ করে দিলে মিডিয়া ফাইল গ্যালারিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেভ হয় না। পাশাপাশি ‘একবার দেখুন’ অপশনে পাঠানো ছবি বা ভিডিও একবার খোলার পর নিজে থেকেই মুছে যায়, যা সংবেদনশীল কনটেন্টের ক্ষেত্রে বাড়তি সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, হোয়াটসঅ্যাপের নিরাপত্তা অনেকটাই ব্যবহারকারীর সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল। নিয়মিত অ্যাপ আপডেট করা, নিরাপত্তা সেটিংস যাচাই করা এবং সন্দেহজনক লিঙ্ক বা বার্তা এড়িয়ে চলাই পারে প্রতারণা ও তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন আমাদের জীবন সহজ করছে, তেমনি সঠিক ব্যবহার না জানলে তা বিপদের কারণও হতে পারে—এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করা জরুরি।